যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মেধাবী তরুণরা দেশ ছাড়ছেন কেন

পার্থিব আহসান

প্রকাশ : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১১:০০ এ এম
মেধাবী তরুণরা দেশ ছাড়ছেন কেন

যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি এবং ভবিষ্যতের কাণ্ডারি হলো সেই রাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্ম। একটি দেশের সমৃদ্ধি কতটা সুদূরপ্রসারী হবে, তা নির্ভর করে সেই দেশের যুবসমাজের মেধাকে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে তার ওপর। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেই সম্ভাবনাময় তরুণদের চোখেই আজ গভীর হতাশা ও অনিশ্চয়তার ছায়া সুস্পষ্ট।

বছরের পর বছর কঠোর অধ্যবসায় ও অর্থ ব্যয় করে উচ্চশিক্ষা অর্জন করার পরও দেশের তরুণরা যখন তাদের মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ পান না, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনে সৃষ্টি হয় এক গভীর শূন্যতা। দেশে কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধনশীল ব্যয়, কাজের পরিবেশের অভাব এবং যোগ্যতা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত আয় না হওয়া তাদের প্রতিনিয়ত হতাশ করছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, সীমিত কর্মসংস্থান, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি, যা মেধাবী শিক্ষার্থীদের আস্থাহীনতার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল ফ্লো অফ টেরিটরি—লেবেল স্টুডেন্টস’ এর তথ্যমতে, ২০২২ সালেই ৪৯ হাজার ১৫১ জন শিক্ষার্থী দেশ ছেড়েছেন। বাংলাদেশ ইউথ লিডারশিপ সেন্টার ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইউথ মেন্টারস সার্ভে-২০২৩’ এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের আটটি বিভাগের পাঁচ হাজার ৬০৯ জন তরুণ-তরুণীর ৭৫.৫ শতাংশ তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্য দেশ ছাড়তে চান। যোগ্যতানুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব হলো প্রধান বড় কারণ।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রযুক্তির উৎকর্ষ, উন্নত যোগাযোগ ও তথ্যের সহজলভ্যতায় ভৌগোলিক সীমান্ত এখন অনেকটা শিথিল হয়ে এসেছে, যা তরুণদের সামনে উন্মোচন করেছে বৈশ্বিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। তবে একই সময়ে তাদের কর্মসংস্থানের সংকট, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও দেশের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাগুলো বিদেশমুখী হতে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে।

দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ সীমিত। পড়াশোনা শেষে দীর্ঘসময় বেকার থাকা কিংবা কাজ পেলেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অপ্রতুল আয় তরুণদের হতাশ করছে। ফলে একটি অর্থবহ, স্থিতিশীল ও নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায় তারা ক্রমান্বয়ে বিদেশমুখী হচ্ছেন।

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এর ধরনেও এসেছে লক্ষণীয় পরিবর্তন। অতীতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থান নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণ-তরুণীরাও এতে বিপুল সংখ্যায় এগিয়ে আসছেন। বিশেষ করে, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তনের ফলে অনেক তরুণী এখন বিয়ের পূর্বেই উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ব্রিটিশ কাউন্সিলের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫৫ শতাংশ তরুণ-তরুণী বিদেশে যেতে আগ্রহী। ২০২৫ সালের আগস্টে রেকর্ড এক লাখ ৪২ হাজার ৬৬৫ জন বিদেশে গিয়েছেন। তবে বিদেশগমন করা শ্রমিকদের অনেকেই এখনো অদক্ষ, ফলে তারা তুলনামূলক কম আয় করতে সক্ষম হচ্ছেন। এর ফলে প্রত্যাশিত হারে রেমিট্যান্স আসছে না, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, মেধাবী তরুণেরা বিদেশে পাড়ি জমানোয় দেশ দক্ষ কর্মশক্তি হারাচ্ছে।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের বিদেশমুখী হওয়ার বর্তমান প্রবণতার নেপথ্যে কাজ করছে বহুমাত্রিক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ। দেশে মানসম্মত শিক্ষা, সুনির্দিষ্ট গবেষণার পরিবেশ এবং উচ্চশিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় জ্ঞানভিত্তিক ক্যারিয়ার গঠনে ইচ্ছুক তরুণরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন।

কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট তরুণদের বিদেশমুখী করার অন্যতম কারণ। শিক্ষাজীবন শেষে দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব, যোগ্যতানুযায়ী কাজের অভাব কিংবা অপ্রতুল বেতন তরুণ সমাজে গভীর হতাশা তৈরি করছে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে দেশের আয়কাঠামো সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় অনেক তরুণই বিশ্বাস করেন, সমপরিমাণ শ্রম দিয়ে বিদেশে আরও উন্নত ও সুসংহত জীবনযাপন সম্ভব।

উন্নত জীবনমান, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও সুদৃঢ় সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি তরুণদের বিদেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্তকে আরও ত্বরান্বিত করে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তাদের মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ফলে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি অগ্রাধিকার পাওয়ায় তরুণ সমাজ দেশের সার্বিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে।

একসময় যাদের দেশ গড়ার মূল কারিগর ভাবা হতো, তাদের এক বিশাল অংশ এখন বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও, পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার আগ্রহ তাদের মধ্যে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এর মূলে রয়েছে উন্নত জীবনমানের আকাঙ্ক্ষা। পেশাগত নিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সুযোগ-সুবিধা এবং মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা তরুণদের একটি সুশৃঙ্খল জীবনের প্রতি আকৃষ্ট করছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের সম্ভাবনা পুরোপুরি বিকশিত করা সম্ভব বলেই তারা বিশ্বাস করে। যদিও নতুন সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় মানসিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়, তবুও নিজ প্রচেষ্টায় সফল হয়ে অনেকেই নিজেদের ও পরিবারের আর্থসামাজিক ভিত্তি সুদৃঢ় করছেন।

তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমাতে হলে সংকটের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী করে তোলা জরুরি। শুধু সনদসর্বস্ব শিক্ষা নয়, বরং বাজারচাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে হবে, যেন শিক্ষাজীবন শেষেই তারা দ্রুত কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারে।

পাশাপাশি দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাত বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, উৎপাদনমুখী শিল্প ও সৃজনশীল খাতে তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ বিস্তৃত করা গেলে দেশেই একটি সুদৃঢ় ও প্রতিশ্রুতিশীল কর্মবাজার গড়ে তোলা সম্ভব।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি খাতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ নিয়োগব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেন তরুণরা গভীরভাবে বিশ্বাস করতে পারে যে, কেবল মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই তাদের মূল্যায়ন হবে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ তরুণ সমাজকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যখন তারা অনুভব করবে যে নিজ দেশেই একটি নিরাপদ, ঝুঁকিমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গঠন করা সম্ভব, তখন বিদেশমুখী হওয়ার এই প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পাবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের বিকাশ ঘটাতে একটি সমন্বিত ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞদের দিকনির্দেশনা ও পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বহু তরুণ চাকরি খোঁজার পরিবর্তে নিজেই কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। পাশাপাশি দেশে একটি প্রাণবন্ত স্টার্টআপ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে যেমন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তেমনই জাতীয় অর্থনীতিও বহুগুণে গতিশীল হয়ে উঠবে।

পরিশেষে, তরুণদের জন্য দেশে একটি ইতিবাচক, সম্ভাবনাময় ও টেকসই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা বিধান করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মনে এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে, স্বপ্নপূরণের একমাত্র গন্তব্য বিদেশ নয়; বরং দেশেই রয়েছে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ, উপযুক্ত সম্মান ও সাফল্যের সম্ভাবনা। এই আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারলেই মেধা পাচার রোধ করা এবং জাতীয় উন্নয়নে তরুণ প্রজন্মের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের তরুণদের বিদেশমুখী হওয়া কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকট ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের আকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ। মানসম্মত শিক্ষা, কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নিরাপদ জীবনের খোঁজে তারা আজ দেশ ছাড়ছেন। তবে মূল সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এই পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং স্থিতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের এই প্রস্থানপ্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। কারণ তরুণ প্রজন্মই একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি; তাদের মেধা ও সম্ভাবনাকে দেশে ধরে রাখতে পারলেই কেবল টেকসই উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা সম্ভব।

লেখক: যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)