যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

রেলযাত্রা যেন মৃত্যুফাঁদ না হয়

প্রকাশ : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
রেলযাত্রা যেন মৃত্যুফাঁদ না হয়

ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে ট্রেনে উঠতে গিয়ে রাবেয়া খাতুন নামে এক নারী যাত্রী দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারানোর মর্মান্তিক ঘটনার একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা, যাত্রীদের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দেওয়ার দীর্ঘদিনের প্রবণতার একটি করুণ পরিণতি। একটি রেলস্টেশনের প্লাটফর্ম কতটা নিরাপদ, যাত্রীরা নির্বিঘ্নে ট্রেনে ওঠানামা করতে পারছেন কি না, যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন আবারও সামনে এনেছে এই মর্মান্তিক ঘটনা।

সুবর্ণভূমির প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মোবারকগঞ্জ স্টেশনের প্লাটফর্ম নিচু হওয়ায় ট্রেনে ওঠার সময় পা পিছলে নিচে পড়ে যান ওই নারী। এরপর ট্রেনের চাকায় তার দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি রেলস্টেশনের প্লাটফর্ম এমন হওয়া কি স্বাভাবিক, যেখানে একজন যাত্রীকে ট্রেনে ওঠার সময় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতে হবে?

রেলপথ সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন। বিশেষ করে দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন রেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে রেলওয়ের অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার কোনো ত্রুটির দায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জনগণের জীবন ও স্বার্থ জড়িত। যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, অথচ তাদের নিরাপদে ট্রেনে ওঠানামার পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রেলস্টেশনের প্লাটফর্মের উচ্চতা, ট্রেনের দরজা ও প্লাটফর্মের মধ্যকার দূরত্ব, আলো, ফুটওভারব্রিজ, সতর্কতামূলক সংকেত, প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা—সবকিছুই যাত্রীবান্ধব ও নিরাপদ হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ট্রেন ছাড়ার সময় যাত্রী ওঠানামা করছেন কি না, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও রেল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। কোনো যাত্রী ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করছেন অথচ ট্রেন চলতে শুরু করেছে—এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

দুর্ঘটনা ঘটার পর উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কেবল ‘দুঃখজনক ঘটনা’ বলে দায় শেষ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। কোথায় অবকাঠামোগত ত্রুটি ছিল, কেন সেটি দীর্ঘদিন ধরে সংশোধন করা হয়নি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব কী ছিল—তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

মোবারকগঞ্জের ঘটনাটি রেলওয়ের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দেশের প্রতিটি রেলস্টেশন ও প্লাটফর্ম জরুরি ভিত্তিতে পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। যেখানে প্লাটফর্ম নিচু বা ক্ষতিগ্রস্ত, সেখানে দ্রুত সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি যাত্রী ওঠানামার সময় ট্রেন পরিচালনায় নিরাপত্তা প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

রেলওয়ে কোনো বিলাসী সেবা নয়; এটি জনগণের সম্পদ ও অধিকারভিত্তিক গণপরিবহন। তাই রেলের উন্নয়ন মানে শুধু নতুন লাইন, নতুন ট্রেন কিংবা গতি বাড়ানো নয়। এর অর্থ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মানবিক রেলব্যবস্থা গড়ে তোলা। একজন যাত্রী যেন স্টেশনে পৌঁছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে উঠতে বাধ্য না হন—এটুকু নিশ্চয়তা রাষ্ট্র ও রেল কর্তৃপক্ষকে দিতেই হবে।

রাবেয়া খাতুনের মর্মান্তিক মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি আমাদের রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার ঘটনা। এই প্রশ্নের উত্তর তদন্ত, জবাবদিহি এবং দৃশ্যমান সংস্কারের মধ্য দিয়েই দিতে হবে। আর কোনো পরিবার যেন রেলস্টেশনের অব্যবস্থাপনার কারণে এমন অপূরণীয় ক্ষতির শিকার না হয়—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)