যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ইসকনে ক্ষুব্ধ খোদ সনাতনিরা

বিশেষ প্রতিনিধি ও স্টাফ রিপোর্টার

, যশোর

প্রকাশ : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
ইসকনে ক্ষুব্ধ খোদ সনাতনিরা

যশোরের একটি ঐতিহাসিক মন্দিরে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর ইসকনের বিতর্কিত তৎপরতায় ক্ষুব্ধ খোদ সনাতনিরা। সম্প্রতি মন্দির চত্বরে বসবাসকারী এক কিশোরীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর সুবর্ণভূমি অনুসন্ধান শুরু করলে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।

মৃত কিশোরীর পরিবার দাবি করছে, ইসকনের কর্মকর্তা ও মন্দিরের অধ্যক্ষ অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাসের যৌন হয়রানির শিকার হয়ে ক্ষোভে-দুঃখে মেয়েটি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এই ঘটনার পর গা-ঢাকা দিয়েছেন অপার গোবিন্দ।

কিশোরীর মৃত্যুর পর পরিবারটির পক্ষ থেকে থানায় যে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়, সেখানে ‘যৌন হয়রানির’ কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ ইসকনের প্রভাবে সেই অভিযোগ গ্রহণ না করে ‘নিজেদের ইচ্ছামতো অভিযোগ’ লিখে তা লিপিবদ্ধ করে বলে অভিযোগ। জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্তারা অবশ্য বলছেন, যদি এই ঘটনায় কেউ দোষী প্রমাণিত হন, তাহলে তিনি যত ক্ষমতাশালীই হোন না কেন, বিচারের আওতায় আসবেন।

মন্দির চত্বরে বসবাসকারীরা বলছেন, তাদের উচ্ছেদের জন্য অপার গোবিন্দের নেতৃত্বে ইসকনপন্থিরা নানা তৎপরতা চালান। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি পরিবার উচ্ছেদ হয়ে গেছে। এখন তাদের লক্ষ্য গোটা মন্দির চত্বর গ্রাস করা। স্থানীয় হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে বলছেন, ইসকনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর সেখানে উসকানিমূলক কার্যক্রম চলছে। ফলে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে।

ইসকনের এই ‘সাধুদের’ বিরুদ্ধে নারীঘটিত ছাড়াও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। স্বয়ং মন্দির কমিটির সভাপতির ভাষ্য, অপার গোবিন্দ লোক সুবিধার নন। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ। আর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতির মতে, ‘সাধু’ ভালো লোক।

সুবর্ণভূমির অনুসন্ধান

শিপ্রার মৃত্যুর পর বিষয়টি নিয়ে সুবর্ণভূমি অনুসন্ধানে নামে। সুবর্ণভূমির প্রতিবেদক চাঁচড়া দশমহাবিদ্যা মন্দির ও আশপাশের এলাকাবাসী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেন। স্থানীয় হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে বহু মানুষ ইসকন এবং মন্দিরটির অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইসকনের বিরুদ্ধে মুসলিমদের চেয়ে সনাতনিদের অভিযোগ বেশি। তারা সাম্প্রদায়িক উসকানি, অর্থ ও নারীঘটিত বিষয়াদি, মন্দির গ্রাস করে নেওয়ার অভিযোগ আনেন ‘সাধুদের’ বিরুদ্ধে।

কিশোরীর ‘আত্মহত্যা’, নানা প্রশ্ন

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে শহরের চাঁচড়া দশমহাবিদ্যা মন্দির চত্বরের একটি জীর্ণ কুটিরের মধ্যে থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় শিপ্রা ঘোষ (১৭) নামে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার হয়। শিপ্রা মৃত নিরদ কুমার ঘোষের মেয়ে। সে শহরতলীর ভাতুড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

পরদিন যশোর জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শিপ্রার লাশ নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে রাস্তার ওপর বিক্ষোভ করেন স্বজনসহ স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, দশমহাবিদ্যা মন্দিরের অধ্যক্ষের অসদাচরণ, যৌন হয়রানি, মারধর, অপমান-অপদস্তের শিকার হয়ে শিপ্রা আত্মহত্যা করেছে।

বিক্ষোভকালে শিপ্রার ভাইসহ স্থানীয় সনাতনিরা মন্দিরের অধ্যক্ষসহ ইসকনপন্থি ‘সাধুদের’ বিরুদ্ধে গুরুতর নানা অভিযোগ তোলেন। তারা বলেন, ইসকনের এই কর্মকর্তারা সাধু নন, তারা নারী ও অর্থলোভী। মন্দিরে নিয়মিত নারীদের যাতায়াত আছে। সেখানে অসামাজিক কার্যকলাপ হয়। এমনকী তারা বেশ কয়েকজন নারীকে ভারতেও ভাগিয়ে নিয়ে গেছেন।

শিপ্রা যে প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী ছিল সেই ভাতুড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা ২২ সেপ্টেম্বর তাদের বিদ্যাপীঠের সামনের রাস্তা এবং প্রেসক্লাব যশোরের সামনে বিক্ষোভ করে। তাদের দাবি, শিপ্রা অত্যন্ত নম্র-ভদ্র মেয়ে ছিল। সে পড়ালেখায়ও ভালো। মন্দির অধ্যক্ষ তাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছেন। তারা ওই অধ্যক্ষের বিচার দাবি করে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপিও দেন।

চত্বরে মরদেহ রেখে অনুষ্ঠান, তীব্র প্রতিক্রিয়া

১৮ তারিখে মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত শেষে শিপ্রার মরদেহ ১৯ সেপ্টেম্বর আনা হয় চাঁচড়া দশমহাবিদ্যা মন্দির চত্বরে তাদের কুটিরে। সেখানে তখন স্বজনদের আহাজারি আর বিলাপে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু পাশেই ছিল উৎসবের আমেজ।

সেদিন ছিল রাধাষ্টমী। এই উপলক্ষে সকালেই ইসকন মন্দিরটিতে পূজা-উৎসব শুরু হয়। কয়েকশ’ ভক্ত মন্দিরটিতে জড়ো হয়। চলছিল বাদ্য-বাজনাসহ পূজা-অর্চনা।
ইসকন ‘সাধুদের’ এই তৎপরতা স্থানীয়দের গভীরভাবে ব্যথিত করে। তারা বলছেন, শোকাহতরা মন্দিরের পুরোহিতসহ কর্তাদের দিকে তেড়ে গেলে ভক্তদের অনেকেই উৎসব ফেলে পালিয়ে যান। এই সুযোগে গা-ঢাকা দেন অপার গোবিন্দসহ তার ঘনিষ্ঠ সহচররাও।

মন্দির চত্বরে বসবাসকারী মৌসুমি ঘোষ বলেন, ‘বাড়িতে যখন একটা লাশ আসে, তখন মানে এই তো আমাদের একই তো বাড়ি, এই মন্দির, এই বাড়ি। এই বাড়িতে যখন একটা মেয়ের লাশ আসে, সে (অধ্যক্ষ) কীভাবে ৩০০ লোকের আয়োজন করে খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠান, ঢোল-কীর্তন বাজায়, কীর্তন... ঠিক আছে, সেটা আমাদেরই ধর্মীয় অনুষ্ঠান। কিন্তু সেটা কি অল্প করে করা যায় না? মানুষজনকে কি অল্প করে আনা যেত না? কিন্তু সে সেটা করেনি। সে মানে... তারপর অনেকে বলছে যে আপনি এটা করেন না, তখনও সে অনেক রকম বাজে ব্যবহার, বাজে কথাও বলেছে। যখন আমরা একটু মাথা চাড়া দিয়ে উঠছি, তার বিরুদ্ধে গেছি, তারপরে সে পালায় (পালিয়ে) গেছে এখান থেকে।’

দশমহাবিদ্যা ইসকন মন্দিরের সভাপতি বিশ্বনাথ দত্তের কথায়, ‘‘একটা মেয়ে মারা গেছে... আর তারপরে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসার পরে ওখানে লাশটা রাখছিল। মন্দিরের ভেতরেই তো। লাশটা রাখার পরেও ইসকনওয়ালাদের অনুষ্ঠান চলছিল। তখন ইসকনওয়ালারা বলে, ‘এই, ওদিকে নিয়ে যাও, সরাও। ওদিকে রাখো, এখানে রাখা যাবে না।’ একটা মেয়ে মারা গেছে, আর তারা (ইসকনের ‘সাধুরা’) আনন্দ-ফূর্তি করে যাচ্ছে, এটা কেমন!”

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতন ১৯ সেপ্টেম্বর মন্দিরটিতে গিয়ে অনুষ্ঠান চলতে দেখেন বলে স্বীকার করেন। রতনের দাবি, তার হস্তক্ষেপেই অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়।

তবে অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস দাবি করেন, তিনিই অনুষ্ঠান বন্ধ করেন এবং পরিস্থিতি বুঝে মন্দির থেকে সরে আসেন। তিনি এখন কোথায় আছেন— প্রশ্ন করেও উত্তর মেলেনি।

মন্দির চত্বরে বসবাসকারী ও আশপাশের সনাতনিরা অপার গোবিন্দ দাসকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি করেছেন। একইসাথে তারা মন্দিরটি থেকে ইসকনকে উচ্ছেদের দাবিও জানান।

শিপ্রার বিষয়ে যা বলছেন শিক্ষক-সহপাঠীসহ অন্যরা

শিপ্রার সহপাঠীরা বলছে, নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসার পাশাপাশি পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী ছিল সে। বন্ধুদের সাথে আচরণ ছিলো একেবারে স্বাভাবিক। আর আত্মহত্যা করার মতো মেয়ে শিপ্রা না।

তার এক বান্ধবী বলে, ‘শিপ্রা আমাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতো। ক্লাসে কখনো মনমরা করে বসে থাকতে দেখিনি। একটা হাসিখুশি মানুষ, সে কখনোই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।’

ওই সহপাঠী আরও দাবি করে, পড়াশোনার পাশাপাশি ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলতো শিপ্রা। আর একজন ধার্মিক মানুষ কখনো আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেবে না। নিশ্চয় এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

ভাতুড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাধ্যমিক শাখার বিজ্ঞান শিক্ষক অমলকৃষ্ণ সরকার বলেন, শিপ্রা লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল। সে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতো, পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। আর্থিক দুরবস্থা না থাকলে সে আরও ভালো ফলাফল করতে পারতো। সহপাঠীদের সাথে সদ্ব্যবহার করতো। তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।

ভাতুড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেদিন দুই দফা মানববন্ধন-বিক্ষোভ করেন, সেখানে বক্তারা সবাই শিপ্রার প্রশংসা করেন।

অধ্যক্ষ মো. আরিফুজ্জামান, সহকারী প্রধান শিক্ষক কামরুজ্জামান, সিনিয়র শিক্ষক শফিকুল ইসলাম, চায়না খাতুন, সাংস্কৃতিক সংগঠক হারুন অর রশিদ প্রমুখ একই সুরে কথা বলেন।

মন্দির চত্বরের বাসিন্দা অনুপমা ঘোষ বলেন, ‘আসলে না, ও মরার মতন মেয়ে না... ও খুব নরম ঠান্ডা প্রকৃতির মানুষ ছিল, একদম চুপচাপ স্বভাবের।’

দশমহাবিদ্যা মন্দিরের সামনের অংশে নির্মিত মার্কেটে থাকা স্থানীয় লোকদের সবাই একবাক্যে বলেন, ‘মেয়েটি খুবই ভদ্র ছিল। সে এই রাস্তা দিয়েই স্কুলে যাতায়াত করতো মাথা নিচু করে।’

দশমহাবিদ্যা মন্দিরের ইতিহাস ও ইসকনের অনুপ্রবেশ

শহরের দক্ষিণাংশে চাঁচড়া এলাকায় অবস্থিত দশমহাবিদ্যা মন্দিরটি যশোর জেলার পুরনো স্থাপনাগুলোর একটি। চাঁচড়ার রাজবংশ এটির প্রতিষ্ঠাতা। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল সুনির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও রাজা শুকদেব রায় (১৭২৯-১৭৪৫) ও রাজা শ্যামসুন্দর রায় (১৭৩১-১৭৫০) তাদের রাজত্বকালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন বলে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্র তার ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ওই গ্রন্থে বলা হয়েছে, এখানে মোট ১৬টি বিগ্রহ ছিল—গণেশ, সরস্বতী, কমলা, অন্নপূর্ণা, ভুবনেশ্বরী, জগদ্ধাত্রী, ষোড়শী, মহাদেব, কালী, তারা, ভৈরবী, চিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও ভৈরব।

শাসনাবসানের পর চাঁচড়ার রাজাদের বংশধররা বর্তমান ভারতের বিভিন্ন স্থানে চলে যান। যাওয়ার আগে তারা মন্দিরগুলো দেখভাল ও পূজা-অর্চনার দায়িত্ব দিয়ে যান বেশকিছু স্থানীয় ব্রাহ্মণকে। কিন্তু কালক্রমে সেই ব্রাহ্মণরাও ভারতে পাড়ি জমান। পরে স্থানীয় সনাতনিদের দিয়ে কমিটি গড়ে মন্দিরগুলো পরিচালনা করা হতে থাকে। ২০১৬ সালে দশমহাবিদ্যা মন্দিরে আবির্ভূত হয় আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকন। কমিটি থাকলেও ক্রমে ইসকনের কথিত সাধুরাই মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নেন বলে জানান স্থানীয় সনাতনিরা।

এই বিষয়ে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতনের দাবি, জরাজীর্ণ মন্দিরটির দেখভাল ও পূজা-অর্চনা অব্যাহত রাখতে ইসকনকে স্থানীয় হিন্দুরাই ডেকে এনেছিল। এখন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তো হবে না!

তবে মন্দির চত্বরে বসবাসকারী পাপন ঘোষ, রিপারানি ঘোষ ও প্রান্ত ঘোষ বলছেন, পূজা উদযাপন পরিষদ ও মন্দির কমিটিকে ‘ম্যানেজ’ করে ইসকন এখানে আস্তানা গড়ে তোলে।

(আগামীকাল দ্বিতীয় পর্ব)

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)