যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

খরচের টাকা জোগাচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তারা

ডোপ টেস্টে ২২২ মাদকসেবীর দণ্ড

সরকারি বরাদ্দ না পেলে সামারি ট্রায়াল বন্ধের শঙ্কা

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি

প্রকাশ : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
ডোপ টেস্টে ২২২ মাদকসেবীর দণ্ড

মাদক নিয়ন্ত্রণে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের ডোপ টেস্ট কার্যক্রমে সাফল্য মিললেও অর্থসংকটে পড়েছে উদ্যোগটি। গত ১৪ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডোপ টেস্টে ২২২ জনের মাদক সেবনের প্রমাণ পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে ১৭৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামিদের ১৫ দিন থেকে এক বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে মোট ২৩৫ জনের ডোপ টেস্ট করা হয়।

তবে ডোপ টেস্টের জন্য কোনো সরকারি অর্থ বরাদ্দ না থাকায় পরীক্ষার খরচ বহন করতে হচ্ছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) নিজেদের পকেট থেকে। ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় নিজেদের অর্থে এ কার্যক্রম কতদিন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি অর্থ বরাদ্দ না থাকলে একপর্যায়ে ডোপ টেস্টের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত বিচার বা সামারি ট্রায়ালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে মাদকসংক্রান্ত মামলাগুলো গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করতে হবে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ গত ১৪ জুলাই ডোপ টেস্ট কার্যক্রম শুরু করে।

মাদক ব্যবসায়ী, সেবনকারী কিংবা মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের পর তার ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। পরীক্ষার ফল পজিটিভ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে দণ্ড দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি দণ্ড শৈলকুপায়

পুলিশ ও আদালত সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৪ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় ৩৫ মামলায় ৫০ জন, শৈলকুপায় ৭৮ মামলায় ৮৫ জন, হরিণাকুণ্ডুতে আট মামলায় ১২ জন, কালীগঞ্জে ২৩ মামলায় ২৯ জন, কোটচাঁদপুরে আট মামলায় দশজন এবং জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ২৩ মামলায় ৩৫ জনকে দণ্ডের আওতায় এনেছে।

ডোপ টেস্টের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রয়োজনীয় ল্যাব, কিট ও অন্যান্য সুবিধা না থাকায় শুধু ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পরীক্ষা করা হচ্ছে। জনপ্রতি পরীক্ষায় খরচ হচ্ছে ৯০০ টাকা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই এ খরচ ব্যক্তিগতভাবে বহন করছেন।
সহযোগিতার আশ্বাস, মেলেনি অর্থ

এ পর্যন্ত শুধু ‘আগামীর শৈলকুপা’ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে শৈলকুপা থানায় ৪২ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ৭০টি ডোপ টেস্টের খরচ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জোহান পার্ক থেকেও কিছুসংখ্যক টেস্টের খরচ দেওয়ার কথা রয়েছে। জেলা প্রশাসকও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে এসব প্রতিশ্রুত অর্থ এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।

ফলে দিনের পর দিন নিজেদের পকেট থেকে অর্থ ব্যয় করে ডোপ টেস্ট কার্যক্রম চালিয়ে যেতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপপরিদর্শক বলেন, প্রতিটি ডোপ টেস্টের খরচ তাদের নিজেদের বহন করতে হচ্ছে। আপাতত নিজেদের টাকা দিয়েই পরীক্ষা করানো হচ্ছে। কিন্তু পরে এই অর্থ ফেরত পাওয়া না গেলে ঘাটতি পূরণ হবে কীভাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গৌরাঙ্গ কুমার বসু বলেন, ‘ডোপ টেস্টের জন্য কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই। এখন পর্যন্ত প্রতিটি টেস্টের খরচ নিজেদের অর্থে বহন করেছি। কত দিন এভাবে পারব, জানি না।’

শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, ‘শুধু আগামীর শৈলকুপা থেকে ৪২ হাজার টাকা পেয়েছি। তারা আরও কিছু সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। বাকি কাজগুলো সম্পূর্ণ আমাদের নিজেদের অর্থে করতে হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিজেদের পকেট থেকে কত টাকা এভাবে খরচ করতে পারবো, জানি না। খরচের জন্য মানুষের কাছে হাত পাততেও পারবো না। সরকারি অর্থ বরাদ্দ না দিলে একসময় আমরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবো।’

সরকারি বরাদ্দের দাবি

মানবাধিকারকর্মী শরিফা খাতুন বলেন, ‘ডোপ টেস্টের মাধ্যমে মাদকসেবী শনাক্ত করা হলে মাদক নিয়ন্ত্রণে তা খুবই কার্যকর হবে। তবে এ কার্যক্রম চালিয়ে নিতে সরকারি অর্থ বরাদ্দ খুবই প্রয়োজন।’

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। এর মধ্যে চার থেকে পাঁচটি টেস্টের জন্য পুলিশ আসামিদের নিয়ে আসে।

তিনি বলেন, ডোপ টেস্টের কিট সরকারি এমএসআর (মেডিকেল সার্জিক্যাল রিকুইজিট) সামগ্রীর মাধ্যমে বরাদ্দ হয়। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য সরকার নির্ধারিত ৯০০ টাকা নেওয়া হয়। এ অর্থ পরবর্তী সময়ে রাজস্ব খাতে জমা দেওয়া হয়। তবে ডোপ টেস্ট বিনা মূল্যে করার কোনো নির্দেশনা নেই।

‘সরকারি অর্থ না পেলে সামারি ট্রায়ালে যাবো না’

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান বলেন, ‘সমাজের মানুষ, বিভিন্ন পরিবার থেকেও চাইছে মাদকসেবনকারীদের শনাক্ত করা হোক এবং তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। সে কারণেই ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। তবে এ কাজে আমাদের কোনো সরকারি অর্থ বরাদ্দ নেই। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই নিজেদের অর্থে খরচ বহন করছেন।’

তিনি বলেন, ‘এই টাকা বিভিন্ন অনুদান থেকে অর্থ পাওয়া গেলে তারা ফেরত পাবেন। তবে ঠিক কবে তা পাওয়া যাবে, বলা যাচ্ছে না।’

নিজেদের অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে থানা পুলিশের আগ্রহ কমে যাবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘কেউ অর্থ না দিলে সামারি ট্রায়ালে যাবো না। তখন গতানুগতিক মামলা হবে। এ ক্ষেত্রে আগ্রহ হারানো অস্বাভাবিক নয়।’

পুলিশ সুপার আরও বলেন, বিষয়টি এখনো পুলিশ সদর দপ্তরে জানানো হয়নি। তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের গঠিত কমিটির ঝিনাইদহে তদারকির দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে যদি ডোপ টেস্ট ফ্রি করে দেওয়া হয়, তাহলেও ভালো হয়।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)