যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

‘আড়ং হতে সাবধান’

সুবর্ণভূমি ডেস্ক

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৩:১২ এ এম
‘আড়ং হতে সাবধান’

এনজিও ব্র্যাকের অধীনে একটি সামাজিক ব্যবসা বা সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ হিসেবে আড়ং-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। কথা ছিল ব্যবসা থেকে অর্জিত লাভের ৫০ শতাংশ সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় যাবে এবং বাকি ৫০ শতাংশ ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হবে। বাস্ততে তা হচ্ছে না। সব ক্ষেত্রে প্রতারণা করা হচ্ছে। প্রতারিত হচ্ছে নারী কর্মী। এ বিষয়ে সুব্রত তালুকদার অপু নামে একজন তার ফেসবুক পেজে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। সুবর্ণভূমি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

গত ঈদে, পূজায় বা বিশেষ দিনে আড়ং থেকে কেনাকাটা করার পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যখন ড্রেসটা দেখছিলেন, তখন হয়তো কাপড়ের লোগো ট্যাগে টাকার সংখ্যাগুলো দেখে একবারের জন্যও ভাবেননি, এই সুতোর বুননে লুকিয়ে আছে শতাব্দীর সবচেয়ে নিখুঁত এক সাইকোলজিক্যাল ট্র্যাপ! আমরা আড়ং-এর ট্রলি ঠেলে যখন হাজার হাজার টাকা ক্যাশ কাউন্টারে ঢালি, তখন মূলত কাপড় কিনি না আড়ং আমাদের কাছে বিক্রি করে এলিট স্ট্যাটাস আর নৈতিক প্রশান্তির মায়াজাল। কিন্তু সেই মায়াজালের ভেতরের গল্পটা কেমন?

গল্পটা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পৃথিবীর। এক পৃথিবীতে ঢাকার ধুলোবালি এড়িয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল শোরুমে কাস্টমাররা পারফিউমের সুবাসে ট্রলি সাজাচ্ছেন, আর অন্য পৃথিবীতে দেশের কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামের সাব-সেন্টারে বসে এক নারী মাসের পর মাস ট্রেইনিং-এর দোহাই শুনে বিনাবেতনে সেলাই করে চলছেন আড়ং-এর ওই রাজকীয় জামাটি। এনজিও-র ছায়াতলে থেকে কীভাবে ঐতিহ্য আর সমাজসেবার আড়ালে গড়ে উঠলো শত মিলিয়ন ডলারের এক শোষণের গল্প? শুনুন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত. . .

আড়ং-এর চকচকে শোরুম, সুবাসিত পরিবেশ আর অভিজাত লাইফস্টাইলের আড়ালে ঠিক কতটা নিখুঁত সাইকোলজিক্যাল চাতুরি এবং সিস্টেম্যাটিক শোষণ লুকিয়ে আছে, তা একটু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। আমরা যখন আড়ং থেকে তিন-চার হাজার টাকায় একটা সাধারণ সুতির থ্রিপিস বা পাঞ্জাবি কিনে বাসায় ফিরি, তখন অবচেতন মনে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি কাজ করে। আমরা ভাবি, দেশীয় সংস্কৃতি তো লালন করলামই, সাথে হয়তো কোনো দরিদ্র কারিগরের ঘরেও দুটো পয়সা পাঠাতে পারলাম। কিন্তু বাস্তবতার কেস স্টাডি আর তথ্যের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আমাদের এই সামাজিক আবেগ আর বিশ্বাসকে পুঁজি করে কীভাবে গড়ে তোলা হয়েছে শত মিলিয়ন ডলারের এক করপোরেট সাম্রাজ্য, যেখানে আসল কারিগর পান কেবল ঘাম আর শোষণের শিকার হওয়া ভাগ্য।

​১৯৭৮ সালে আন্তর্জাতিক এনজিও ব্র্যাকের অধীনে একটি সামাজিক ব্যবসা বা সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ হিসেবে আড়ং-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কথা ছিল ব্যবসা থেকে অর্জিত লাভের ৫০ শতাংশ সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় যাবে এবং বাকি ৫০ শতাংশ ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হবে। সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আড়ং-এর এই নন-প্রফিট ফর-প্রফিট মডেলে প্রফিট কামানোর তীব্র প্রতিযোগিতা থাকলেও কারিগরদের ভাগ্যোন্নয়নের অডিট রিপোর্ট বা স্বচ্ছ কোনো হিসাবের দেখা পাওয়া যায় না। আড়ং মূলত দুটি মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ করে, আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন এবং স্বাধীন হস্তশিল্পী। ফাউন্ডেশনের ১৫টি উৎপাদন কেন্দ্র ও ৮০০টিরও বেশি সাব-সেন্টারে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি কারিগর কাজ করছেন, যাদের ৯৭ শতাংশই নারী। কিন্তু অঞ্চলভিত্তিক বেতনের গ্রাফ দেখলে চোখ ছানাবড়া হতে বাধ্য। কুড়িগ্রাম সেন্টারের ৩০ শতাংশ কারিগর কোনো বেতনই পান না, পাবনায় ৩৯ শতাংশ সম্পূর্ণ বেতনহীন, আর রাজবাড়ী ও শেরপুরে এই হার যথাক্রমে ৪২ ও ৪৫ শতাংশ! পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আড়ং-এর পণ্য তৈরির প্রক্রিয়ায় যুক্ত গড়ে ৩২ শতাংশ নারী কারিগর সম্পূর্ণ বিনা বেতনে কাজ করতে বাধ্য হন। প্রশিক্ষণ বা ট্রেইনিংয়ের অজুহাতে গ্রামের অসচ্ছল নারীদের দীর্ঘ সময় বিনামূল্যে খাটিয়ে নেওয়ার যে কালচার তৈরি করা হয়েছে, তা নারী ক্ষমতায়ন-এর গল্পের ঠিক বিপরীত এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। অন্যদিকে যে ৬০ হাজার স্বাধীন কারিগর তাদের নিজস্ব উদ্যোগে কাজ করেন, তাদের কাছ থেকে আড়ং একচেটিয়া কম দামে পণ্য কিনে নেয় এবং পেমেন্ট আটকে রাখে মাসের পর মাস। ফলে ঋণের সুদের বোঝা বইতে গিয়ে মূল কারিগররা শেষপর্যন্ত নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

​একটি সাধারণ ১, ৫০০ টাকার পাঞ্জাবির কস্ট ব্রেকডাউন দেখলে এই অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়। যে নারী কারিগর দিন-রাত এক করে সুচ-সুতোয় নকশা আঁকলেন, তার পকেটে যায় মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, যা মোট বিক্রয়মূল্যের ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি নয়। কাঁচামাল, ফ্যাক্টরি খরচ, ডিস্ট্রিবিউশন আর মার্কেটিং-এর বিশাল আউটলেট খরচ মেটানোর পরও আড়ং প্রতি পণ্যে ৫০ শতাংশের ওপরে নিট প্রফিট মার্জিন রেখে দেয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কারিগরের দুঃখ দূর করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসা শুরু হয়েছিল, সেই প্রফিট আসলে যাচ্ছে কোথায়? শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালে উত্তরার আউটলেটে মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে একই পাঞ্জাবির দাম ৭৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১, ৩০৭ টাকা করায় অর্থাৎ ৭৯ শতাংশ কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি করায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর আড়ংকে সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা করেছিল। পরবর্তীতে সেই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া সংস্থাত প্রধানকে হঠাৎ দূরবর্তী জেলায় বদলি করার ঘটনা প্রমাণ করে যে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব কতটা গভীরে বিস্তৃত।

​তাহলে কাপড়ের দাম এত অতিরিক্ত হওয়ার পরও মানুষ কেন বারবার আড়ং-এই ছুটে যায়? এর পেছনে কাজ করে আড়ং-এর অত্যন্ত নিখুঁত ও ডার্ক সাইকোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশন। ডার্ক সাইকোলজির ভাষায় আড়ং মূলত স্নোব ইফেক্ট এবং অ্যাঙ্করিং বায়াস-এর ফাঁদ পেতে রেখেছে। তারা পণ্যের দাম ইচ্ছে করেই অতিরিক্ত রাখে, যাতে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায় এবং এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের তথাকথিত এলিট বা আভিজাত্যের স্ট্যাটাস তৈরি হয়। কাস্টমার যখন আড়ং-এর কাপড় পরে বা আড়ং-এর প্যাকেটে কাউকে উপহার দেয়, তখন সে মূলত কাপড় দেখায় না, সমাজকে বার্তা দেয় যে সে এই চড়া দাম বহন করার ক্ষমতা রাখে। শোরুমে ঢোকা মাত্রই কাস্টমারের চোখে পড়ে লাখ টাকার শাড়ি, যা তার মস্তিষ্কে একটি বিশাল অঙ্কের মানসিক অ্যাঙ্কর তৈরি করে ফেলে। এরপর ৩ বা ৪ হাজার টাকার একটা সাধারণ জামা দেখলে মস্তিষ্ক মনে করে এটা খুব সাশ্রয়ী, অথচ সাধারণ বাজারে ওই কাপড়ের মূল্য ১, ৫০০ টাকার বেশি নয়। একই সাথে তারা নোস্টালজিয়া ও এথিক্যাল গিল্ট-ট্র্যাপিং ব্যবহার করে। আপনার মনে এই অনুভূতি গেঁথে দেওয়া হয় যে আড়ং থেকে কেনাকাটা করা মানে আপনি দেশপ্রেম দেখাচ্ছেন এবং দরিদ্রদের সাহায্য করছেন। ফলে কাস্টমার নিজের অজান্তেই অতিরিক্ত দাম দেওয়াটাকে পুণ্য বা নৈতিক দায়িত্ব মনে করে সান্ত্বনা পায়।

​এমনকি পরিবেশ সুরক্ষার নামে সাম্প্রতিক সময়ে শপিং ব্যাগের জন্য আলাদা ৬০ ও ৭৫ টাকা নেওয়ার যে নিয়ম চালু করা হয়েছে, সেখানেও ব্যবহার করা হয়েছে ডিকয় ইফেক্ট। মাত্র ১৫ টাকার ব্যবধান রেখে ক্রেতাকে মানসিকভাবে বড় ব্যাগটি কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। ১০-১৫ টাকায় তৈরি ব্যাগ কাস্টমারের কাছে ৩-৪ গুণ বেশি দামে বিক্রি করে একদিকে বিশাল প্রফিট তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে সেই টাকা দিয়ে গাছ লাগানোর অজুহাত দিয়ে কোম্পানির নিজস্ব সিএসআর ফান্ড বা সামাজিক দায়বদ্ধতার খরচও কাস্টমারের ঘাড়েই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলন করে শত কোটি টাকার হিসেব আর পরিবেশ রক্ষার ব্যাখ্যা দিলেও বাস্তবতা হলো নিজের পকেটের টাকা বাঁচিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর খরচের বোঝা চাপানোর নাম গ্রিনওয়াশিং ছাড়া আর কিছুই নয়। এনজিও-র ছায়াতলে থেকে রাষ্ট্রীয় ট্যাক্স ছাড় আর আন্তর্জাতিক ফেয়ার ট্রেড সার্টিফিকেটের ঢাল ব্যবহার করে আড়ং আজ বার্ষিক শত শত মিলিয়ন ডলারের এক অর্থনৈতিক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ঐতিহ্য, আভিজাত্য আর সমাজসেবার চকচকে মুখোশটা খুলে ফেললে ভেতরে কেবলি থেকে যায় গ্রামের অসচ্ছল নারীদের শ্রম শোষণ, ডার্ক সাইকোলজিক্যাল প্রাইসিং আর অতিরিক্ত মুনাফালোভের এক চরম সত্য। যতক্ষণ না আমরা সচেতন হয়ে এই ব্র‍্যান্ড মোহের বাইরে এসে কাপড়ের প্রকৃত মান পরখ করবো এবং সরাসরি লোকাল কারিগর ও সততার সাথে কাজ করা স্বাধীন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াবো, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐতিহ্যের নামে কাস্টমারকে এই মনস্তাত্ত্বিক ঠকানো আর প্রান্তিক শ্রমিকের শোষণ চলতেই থাকবে।

                                                                                              

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)