যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

বঙ্গোপসাগরে তিন পরাশক্তির প্রতিযোগিতা

ফারুক হোসাইন

প্রকাশ : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১২:০১ এ এম
বঙ্গোপসাগরে তিন পরাশক্তির প্রতিযোগিতা

কক্সবাজারের মহেশখালীতে নতুন একটি এলএনজি অবকাঠামো স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে রুশ কোম্পানি নোভাটেকের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সাবসিডিয়ারি নোভাটেক মিডলইস্ট। এ নিয়ে চলতি মাসেই পেট্রোবাংলায় একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে কোম্পানিটি।

মহেশখালীতেই একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণে চীনা একটি কোম্পানির প্রস্তাবে জুলাইয়ের শেষ দিকে নীতিগত অনুমোদন দেয় সরকারের অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এ প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে দৈনিক সর্বোচ্চ ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার একটি এফএসআরইউ নির্মাণ করবে চায়না ন্যাশনাল অ্যানার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই)। এর আগে একই টার্মিনাল নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়ে গত মে মাসে আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছিল মার্কিন কোম্পানি এনএস অ্যানার্জি নেভিগেশন। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসনও চলতি মাসে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এক আলোচনায় বাংলাদেশে এফএসআরইউ নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আগ্রহের কথা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া- এ তিন দেশের কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে পরাশক্তিগুলোর বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখছেন ভূরাজনীতির পর্যবেক্ষকরা। তাদের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বিগত বছরগুলোয় ক্রমেই বেড়েছে। বিশেষ করে চীনের জন্য জ্বালানি পণ্য পরিবহনে মালাক্কা প্রণালির সম্ভাব্য বড় বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী দেশগুলো থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহকে। আবার এ অঞ্চলের জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াও সম্পৃক্ততাও দীর্ঘদিনের।

এ অঞ্চলে জ্বালানি খাতে অংশীদারত্বে আগ্রহ বেড়ে যাওয়ার পেছনে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থই বেশি জড়িত বলে মনে করছেন ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে নিয়ে পরাশক্তিগুলোর ভেতরে যে প্রতিযোগিতা, তা নিয়ে রহস্যের কিছু নেই। সবকিছুতেই প্রতিযোগিতা আছে, বঙ্গোপসাগরেও আছে। ব্যবসাটা পরে, ভূরাজনৈতিক স্বার্থই এখানে মুখ্য। বাংলাদেশের সঙ্গেও তাদের ব্যবসা যতটুকু, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ তার চেয়ে বেশি। এখানে বাংলাদেশের করণীয় হলো ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর দিক থেকে বাংলাদেশকে এই ভারসাম্যমূলক অবস্থান থেকে বের হয়ে আসার চাপ থাকবে।’

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তির প্রসঙ্গ টেনে আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘ওই চুক্তির পর বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষাসহ অনেক বিষয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাণিজ্য চুক্তি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক নিয়ে সব বিষয়ে স্বাধীনভাবে আগানো যাবে না বলেই আমার মনে হয়।’

বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি আবর্তিত হচ্ছে আমদানিকৃত এলএনজি-কে ঘিরে। বিষয়টি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করলেও এখনো এ নীতি থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি সরকার। আমদানিকৃত এলএনজি পুনরায় গ্যাসিফিকেশনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে এরই মধ্যে দুটি এফআসআরইউ স্থাপন করা হয়েছে। এর একটি পরিচালনা করছে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট অ্যানার্জি। অন্যটি পরিচালনা করছে সামিট গ্রুপ। রক্ষণাবেক্ষণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য যেকোনো কারণে এর একটি থেকে সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলেই বিঘ্নিত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ। তীব্রতর হচ্ছে গ্যাস সংকট। বাংলাদেশে আরো দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই আগ্রহ প্রকাশ করে আসছিল এক্সিলারেট ও সামিট- দুটি কোম্পানিই। তাদের প্রস্তাব নিয়ে কার্যক্রম কিছুদূর এগিয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ প্রক্রিয়া থমকে যায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দৃশ্যমান হয় এলএনজি খাতে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মহেশখালীতে তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনে সম্ভাব্য জিটুজি চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট অ্যানার্জি, রাশিয়ার নোভাটেক এবং চীনের চায়না ইন্টারন্যাশনাল মেরিন কনটেইনারসসহ একাধিক বিদেশি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে ওঠে। মহেশখালীতে তৃতীয় এফএসআরইউ নির্মাণে মে মাসে পেট্রোবাংলাকে একটি প্রস্তাব দেয় মার্কিন কোম্পানি এনএস অ্যানার্জি নেভিগেশন। পরের মাসেই চীনা প্রতিষ্ঠান সিএনইই পেট্রোবাংলায় একই প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব জমা দেয়। সিএনইইর প্রস্তাবটি এরই মধ্যে সরকারের অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। আর রুশ নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান নোভাটেক মিডল ইস্ট সাগরে এলএনজি সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য সাগরে গ্র্যাভিটি-বেইজড স্ট্রাকচার (জিবিএস) স্থাপনের প্রস্তাব দেয় চলতি মাসের শুরুতেই।

এদিকে, গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশে এফএসআরইউ প্রকল্পে বিনিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এজন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই এলএনজি অংশীদারত্ব আছে, তাই তাদের পুনরায় আগ্রহ দেখানো অস্বাভাবিক নয়। এই জায়গায় যে কথা মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা— সেটি এমনিতেই যে কোনো প্রকল্পে নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। এখানে দেশগুলোর ভূরাজনৈতিক কৌশল থাকতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশের দিক থেকে যার সঙ্গেই চুক্তি হোক, সেটি স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে হতে হবে। তাহলে কূটনৈতিক জটিলতা এড়ানো যাবে।’

দীর্ঘদিন ধরেই দেশের জ্বালানি খাতে শীর্ষ বিদেশি অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। দেশের প্রথম এফএসআরইউটি পরিচালনা করছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট অ্যানার্জি। এছাড়া জাতীয় গ্রিডে স্থানীয়ভাবে উত্তোলিত গ্যাস সরবরাহের অর্ধেক আসছে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে, যা পরিচালনা করছে মার্কিন কোম্পানি শেভরন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন কোম্পানি বাংলাদেশে গ্যাসের মজুদ নিয়ে বিভিন্ন সময় অনুসন্ধান ও সমীক্ষা চালিয়েছে।

জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো উপস্থিতির বিপরীতে বাংলাদেশে এতদিন চীনের বড় বিনিয়োগ এসেছে মূলত বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে। এছাড়া রুশ কোম্পানি গ্যাজপ্রম বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে গ্যাস খাতে অনুসন্ধান ও কূপ খননের কাজ পেয়েছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকেই নতুন একটি এফএসআরইউ স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে। সে জায়গায় চীনের একটি প্রতিষ্ঠানও এফএসআরইউ স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রতিটি দেশই ব্যবসা করতে চায়। তাই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কথা বলছে। এফএসআরইউ স্থাপনের ক্ষেত্রে মূল্য ও বাস্তবায়নের সময়সীমা— দুটিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা উচিত।’

এ বিষয়ে জানতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রতিযোগিতা বঙ্গোপসাগর তীরের অন্যান্য দেশেও

বঙ্গোপসাগর ও এর আশপাশের দেশগুলোর জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া- তিন দেশেরই বড় মাত্রায় সম্পৃক্ততা রয়েছে। ২০২২ সালে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন (ওএনজিসি) এবং মার্কিন এক্সনমোবিল গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সহযোগিতার চুক্তি করে। দেশটির এলএনজি খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব রয়েছে। ২০০০ সালে বঙ্গোপসাগরের উত্তরপূর্ব উপকূলে যৌথভাবে গ্যাস মজুদ অনুসন্ধানে চুক্তি করে ভারতের গেইল ও রুশ প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম। পরে গেইল ২০০৭ সালে প্রকল্পটি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত এরই মধ্যে জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিবাহী পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। চলতি বছরের জুনে চীন ও মিয়ানমার এক যৌথ ঘোষণায় কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান পাইপলাইনকে আরো সম্প্রসারণের করে দুই দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড সংযোগ করার কথা জানায়।

রাশিয়াও এখন মিয়ানমারের অন্য প্রান্তে সমুদ্রকেন্দ্রিক জ্বালানি অবকাঠামোয় আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত বছরেই এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দাওয়েই গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছে একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন, দাওয়েই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার নির্মাণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে সমুদ্রে অনুসন্ধান কার্যক্রমে রুশ বিনিয়োগ নিয়েও কথা হয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো দাওয়েই এলাকায় কাজের সুযোগ মালাক্কা প্রণালী, আন্দামান সাগরসহ সার্বিকভাবে গোটা ভারত মহাসাগর এলাকায়ই রাশিয়ার উপস্থিতিকে আরো শক্তিশালী করে তুলবে।

অন্যদিকে, মার্কিন কোম্পানি শেভরন বহু বছর মিয়ানমারের ইয়াদানা অফশোর গ্যাসক্ষেত্রের বড় অংশীদার ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের এপ্রিলে কোম্পানিটি প্রকল্প ও সংশ্লিষ্ট পাইপলাইন থেকে পুরোপুরি সরে যায়। একই সঙ্গে মিয়ানমারের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সেবা দেওয়ার ওপরেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপিত রয়েছে। ফলে বর্তমানে মিয়ানমারের সমুদ্রকেন্দ্রিক জ্বালানি খাতে চীন ও রাশিয়ার উপস্থিতি শক্তিশালী হলেও যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি তেমন একটা লক্ষণীয় নয়।

সূত্র: ঢাকা স্ট্রিম

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)