যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মন্তব্য প্রতিবেদন

জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়: রাষ্ট্রের সংকটে জনগণের অংশীদারত্ব

এজাজ উদ্দিন টিপু

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়: রাষ্ট্রের সংকটে জনগণের অংশীদারত্ব

জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি কিংবা মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া কখনোই সহজ নয়। এটি নিঃসন্দেহে কঠিন, স্পর্শকাতর এবং কষ্টদায়ক সিদ্ধান্ত। কারণ জ্বালানি তেলের সঙ্গে শুধু গাড়ির চাকা নয়, জড়িয়ে আছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা। তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব কোনো একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তার অভিঘাত গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও।

বিষয়টিকে অনেকটা একটি অভাবের সংসারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সংসারে আয়-ব্যয়ের হিসাব যখন মেলে না, তখন পরিবারের কর্তা কখনো অতিরিক্ত কাজ করেন, কখনো ওভারটাইম করেন, কখনো কম প্রয়োজনীয় খরচ কমান, আবার কখনো বাধ্য হয়ে পরিবারের সদস্যদেরও কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। রাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও অনেকটা একই বাস্তবতা কাজ করে। পার্থক্য শুধু একটাই—সংসারে টানাপড়েনের বোঝা মূলত কর্তার ওপর পড়ে, কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব কোনো না কোনোভাবে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ওপর এসে পড়ে। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজার এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে জনগণের জীবনযাত্রার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারও অত্যন্ত অস্থির। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু তার জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির চাপ শেষ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এসে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে বলেও সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এ অবস্থায় সরকার যদি দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করতে থাকে, তাহলে একদিকে যেমন ভর্তুকির চাপ বাড়ে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার জ্বালানির দাম একবারে অনেকটা বাড়িয়ে দিলে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। ফলে সরকারের জন্য সিদ্ধান্তটি অনেকটা দুই দিক থেকে চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার মতো।

এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্তকে শুধু ‘দাম বাড়ানো’ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি হয়তো যথাযথভাবে বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি এবং জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জড়িত। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, যেকোনো মূল্য সমন্বয়ের চূড়ান্ত প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেই গিয়ে পড়ে। তাই সরকারের দায়িত্ব শুধু মূল্য সমন্বয় করা নয়; এর পাশাপাশি জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ যাতে সহনীয় পর্যায়ে থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা।

এখানেই প্রয়োজন সরকারের সঙ্গে জনগণ, ব্যবসায়ী সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার যেমন জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ, তেমনি জাতীয় সংকটের সময় নাগরিক সমাজ ও ব্যবসায়ী সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। বিশেষ করে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের উচিত অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত মূল্য না বাড়িয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।

একই সঙ্গে সরকারের কাছেও জনগণের প্রত্যাশা রয়েছে—জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার যখন কিছুটা স্বাভাবিক হবে, তখন দেশের বাজারেও তার প্রতিফলন যেন যথাসময়ে দেখা যায়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার সুফলও যেন ভোক্তারা পান। মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিয়মিত পর্যালোচনা এবং বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত জনগণের আস্থা আরও বাড়াতে পারে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দেশের জ্বালানি তেলের বর্তমান মূল্য, কর কাঠামো, ভর্তুকি এবং বাজারব্যবস্থাও নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সীমান্তবর্তী অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। মূল্য ব্যবধান অতিরিক্ত হলে চোরাচালান যেমন বাড়তে পারে, তেমনি বৈধ ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাম্প্রতিক মূল্য সমন্বয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি পাচার রোধের বিষয়টিও সরকারি পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে জনগণের সহযোগিতা পাওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকেও কিছু বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। গণপরিবহন ভাড়া, পণ্য পরিবহন খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে যেন অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি না ঘটে, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যকর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা বিশ্বাস করি, কোনো সরকারই জনগণের কষ্ট বাড়াতে চায় না। বিশেষ করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারকে প্রতিটি কঠিন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থ, দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হয়। আজকের কোনো সিদ্ধান্ত হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কষ্টের কারণ হতে পারে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য যদি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট এড়ানো হয়, তাহলে বিষয়টি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

আমাদের প্রত্যাশা একটাই—এই সংকট যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দ্রুত কেটে যাক, যুদ্ধ ও সংঘাতের অবসান ঘটুক, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসুক। দেশে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। মানুষ আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করুক- একটি সুন্দর, নিরাপদ ও স্থিতিশীল পৃথিবীর স্বপ্ন।

রাষ্ট্রের কঠিন সময়ে জনগণ যেমন সরকারের পাশে থাকবে, তেমনি সরকারের কাছ থেকেও আমরা প্রত্যাশা করি জনগণের কষ্ট, ব্যবসায়ী সমাজের বাস্তবতা এবং দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রকে সামনে রেখে পরবর্তী প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর জ্বালানি তেলের মূল্য ও মূল্য কাঠামো নিয়মিত পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের বাজারে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে।

কারণ রাষ্ট্র আসলে সরকার আর জনগণ—দুই পক্ষের সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান। সংকটের সময়ে যেমন দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে হয়, তেমনি সুদিনের সুফলও ভাগাভাগি করেই এগিয়ে যেতে হয়। আজকের সাময়িক কষ্ট যেন আগামী দিনের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথ তৈরি করে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)