যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

মুসলিমবিদ্বেষ ভারতকে আদিম যুগে নিয়ে যাচ্ছে, ঠেকানো জরুরি

প্রকাশ : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
মুসলিমবিদ্বেষ ভারতকে আদিম যুগে নিয়ে যাচ্ছে, ঠেকানো জরুরি

কোলকাতা সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের উপাধ্যক্ষ ড. মহম্মদী তরন্নুমের ‘অপরাধ’ কী? তিনি কি কলেজের নিয়ম ভেঙেছেন? নাকি ইউজিসি ও বার কাউন্সিলের নিয়ম মেনে ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চেয়েছেন? কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মান্য করা যদি তার অপরাধ হয়, তাহলে প্রশ্ন আরও গভীরে যায়, নিয়ম প্রয়োগ করতে গিয়ে একজন মুসলিম নারী শিক্ষিকাকেই কেন এমন নির্মম হেনস্থার মুখে পড়তে হলো?

অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে দীর্ঘ ২৩ ঘণ্টা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে, অন্ধকার ঘরে আটকে আলো-পাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, খাবার ও পানি দেওয়া হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত প্রবল চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। সেদেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আছে। কিন্তু তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা নিয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়নি।

এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক তার পদত্যাগ নয়; পদত্যাগের পর তার কক্ষে গঙ্গাজল ছিটিয়ে ও ধূপ জ্বালিয়ে তথাকথিত ‘শুদ্ধিকরণ’। কোনও মুসলিম নারীর ব্যবহৃত ঘরকে ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে ‘শুদ্ধ’ করার এই উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের পৈশাচিকতা আর আদিম যুগের মনোবৃত্তি পূরণের মাধ্যমে পশ্চাৎপদ ভারতীয় সমাজে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রবল আকাঙ্ক্ষাকেই নগ্নভাবে সামনে আনে। বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। আর তা হলো, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও হিন্দুত্ববাদ কবলিত ভারতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে মুসলিমদের স্থান হবে না। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে নির্মম অপমানের মুখোমুখি করে বিতাড়িত করা হবে।

আরও বিস্তৃতভাবে বললে, এটি নিছক ছাত্র-প্রশাসন বিরোধ নয়। এটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানসিকতার সেই ভয়ংকর প্রকাশ, যেখানে মুসলিম পরিচয়কে এখনও ‘অশুদ্ধ’, ‘বহিরাগত’ কিংবা কম মর্যাদার বলে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। যে শিক্ষাঙ্গনে সংবিধান, যুক্তিবোধ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও বহুত্ববাদ শেখানোর কথা, সেখানেই যদি একজন মুসলিম নারী শিক্ষিকার কক্ষ ‘শুদ্ধ’ করার নামে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করা হয়, তবে সেটি গোটা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য লজ্জার। প্রাগৈতিহাসিক চিন্তা-চেতনা ধারণকারী নরেন্দ্র মোদির দলের ছাত্র কর্মীরা শুধু রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের জন্য কতটা নীচে নামতে পারে, এটা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

ঘটনাটির সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে সত্য। গোটা ভারতে যেখানেই মোদির দল বিজেপি শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে, সেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন চলেছে ও চলছে। প্রশ্ন হলো, এই পৈশাচিকতার মাধ্যমে মোদি-অমিত শাহরা দেশটাকে কোথায় নিয়ে যেতে চান? আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষা বলে কি কিছু ভারতে থাকবে না? ভিন্ন ধর্মের কোনো অনুসারী কি ওই দেশে সম্মানের সাথে বসবাস করতে পারবে না? তাদের এমন উগ্রতা সংখ্যালঘুদের মধ্যে যে ত্রাসের সৃষ্টি করছে, এর ফলে বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির ভারত কি শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবে?

ছাত্রদের উপস্থিতি-সংক্রান্ত ক্ষোভকে যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, তবে তা শুধু একজন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অন্যায় নয়; এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসনের ওপরও আঘাত। রাজনৈতিক সংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় শিক্ষাঙ্গনে ভয় ও ধর্মীয় বিদ্বেষের পরিবেশ তৈরি হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য।

পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা দেশে মুসলিম শিক্ষকদের উচ্চ প্রশাসনিক পদে প্রতিনিধিত্ব যখন এমনিতেই সীমিত, তখন একজন দক্ষ মুসলিম শিক্ষিকাকে যদি তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়, তবে তা বৃহত্তর বৈষম্যের ছবিরই অংশ। যোগ্যতা দিয়ে অর্জিত পদ যেন ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে—তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে এই ঘটনার প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত অবশ্যই হতে হবে। কারা ঘেরাও করেছিল, কারা তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল, ‘শুদ্ধিকরণ’-এর ঘটনায় কারা যুক্ত ছিল—সবকিছুর জবাব চাই।

ড. তরন্নুমের ঘটনা তাই কেবল একজন উপাধ্যক্ষের অপমানের ঘটনা নয়। এটি প্রশ্ন তুলেছে—ভারতের শিক্ষাঙ্গনে একজন মুসলিম নারী কি তার ধর্মীয় পরিচয় ত্যাগ না করে কি নিরাপদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে বিপদ শুধু ড. তরন্নুমের নয়; বিপদ গণতন্ত্রের। যদিও ভারতে ভোটের রাজনীতি আছে, তবে তা যে মোদির জমানায় এসে শুধুই পোশাকি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে, তা বিশ্ববাসী জানে। মোদির দল ক্রমে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠেছে আমাদের চোখের সামনে। আর ফ্যাসিবাদের পরিণতি কী হতে পারে, প্রতিবেশী বাংলাদেশে এই ক’দিন আগে তা দেখা গেছে। মোদি-শাহরা হয়তো এখনই এই পরিণতি থেকে শিক্ষা নেবেন না। নিলে তারা সগোত্রীয় শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে পেলে-পুষে রাখতেন না।

ভারতীয় সমাজে অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিবাদী, নিদেনপক্ষে সুস্থ চিন্তার কোটি কোটি মানুষ আছেন। তারা ফ্যাসিবাদী ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রবণতা থেকে দেশকে রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের সেই চেষ্টা বেগবান হোক। ড. তরন্নুমের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা নিশ্চয় দাঁড়াবেন আরও শক্তি নিয়ে। তা না হলে দেশটা ফিরে যাবে আদিম যুগে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)