এম জুবায়ের মাহমুদ
, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
সুন্দরবনের নদী থেকে আহরণ করা ছোট কাঁকড়ার চাহিদা এখন বেড়েছে স্থানীয় সফটশেল (নরম কাঁকড়া) হ্যাচারিগুলোতে। বড় কাঁকড়ার তুলনায় ছোট কাঁকড়ার দাম বেশি পাওয়ায় জেলেদের একটি অংশ সুন্দরবন থেকে কম ওজনের কাঁকড়াও ধরে আনছেন। এসব কাঁকড়া সরাসরি জেলেদের কাছ থেকে কিনে নিচ্ছেন হ্যাচারি মালিকেরা।
স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্যামনগরের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ছোট কাঁকড়া কেনাবেচা হচ্ছে। স্থানীয়দের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কেজি ছোট কাঁকড়া লোকালয়ের বাজার ও হ্যাচারিতে বিক্রি হচ্ছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শ্যামনগরসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে। এ সময় জেলে, কাঁকড়া ব্যবসায়ী, সফটশেল কাঁকড়া হ্যাচারি মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ছোট কাঁকড়া আহরণ, কেনাবেচা ও হ্যাচারিতে সরবরাহের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে।
তুলনামূলক দাম বেশি
দাতিনাখালী এলাকার জেলে আবুল হোসেন ও তাইবুর রহমান বলেন, ‘বড় কাঁকড়ার থেকে ছোটগুলোর দাম এখন বেশি দেয় হ্যাচারি মালিকরা। বড় কাঁকড়ার তুলনায় ছোট কাঁকড়া বেশি পাওয়া যায়, এজন্য আমরা ধরে আনি।’
বাড়তি দাম জেলেদের জন্য একটি বড় আর্থিক প্রণোদনা তৈরি করেছে। ফলে নির্ধারিত ওজনের নিচের কাঁকড়া আহরণ ঠেকানো কতটা সম্ভব হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
হরিনগরের জেলে মমিনুর রহমান জানান, ৪০ থেকে ৮০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া প্রতি কেজি প্রায় এক হাজার টাকায় এবং ৮০ থেকে ১২০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া প্রায় এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়।
আর এই চাহিদাই সুন্দরবন থেকে ছোট কাঁকড়া আহরণের প্রবণতা বাড়াচ্ছে বলে জেলেদের দাবি।
হ্যাচারিতে চাহিদা
আড়পাঙ্গাশীয়া হ্যাচারি মালিক তারুণ কুমার বলেন, ছোট কাঁকড়া দ্রুত খোলস বদলায়। এ কারণে সফটশেল উৎপাদনে ছোট কাঁকড়ার চাহিদা বেশি।
বুড়িগোয়ালিনীর জিন্নাহ উল্লাহ বলেন, বড় কাঁকড়া প্রকল্পে দেওয়ার তুলনায় ছোট কাঁকড়ায় লাভ বেশি।
আটুলিয়া ইউনিয়নের বড় কুপট এলাকার হ্যাচারি মালিক উৎপল ও গৌতম বলেন, ৪০ থেকে ১৩০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া ছাড়া হ্যাচারি চালানো কঠিন। বড় কাঁকড়া অনেক সময় খোলস বদলায় না, আবার মারা যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
তারা জানান, সুন্দরবনের পাশের জোরশিং এলাকা থেকে তারা কাঁকড়া কিনে আনেন। একই কথা বলেন হ্যাচারি মালিক কৃষ্ণা রানী।
হ্যাচারি মালিক ও জেলেদের তথ্য অনুযায়ী, ছোট কাঁকড়ার জন্য হ্যাচারিগুলোতে একটি সরাসরি বাণিজ্যিক চাহিদা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হ্যাচারি মালিকরা জেলেদের কাছ থেকেই সরাসরি ছোট কাঁকড়া কিনে নেন।
ফলে, সুন্দরবন থেকে কাঁকড়া আহরণ থেকে শুরু করে হ্যাচারিতে সরবরাহ পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে ছোট কাঁকড়ার বাজার তৈরি হয়েছে।
মানা হচ্ছে না শর্ত
সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য বন বিভাগ থেকে দেওয়া অনুমতিপত্রে কাঁকড়া আহরণের ক্ষেত্রে ওজনের শর্ত উল্লেখ রয়েছে। অনুমতিপত্র অনুযায়ী, ২০০ গ্রামের কম ওজনের পুরুষ কাঁকড়া এবং ১৩০ গ্রামের কম ওজনের নারী কাঁকড়া আহরণ করা যাবে না। কিন্তু অধিকাংশ জেলে ৪০ থেকে ১২০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া আহরণ ও বিক্রির করছেন।
কলবাড়ি, মুন্সিগঞ্জ, নওয়াবেঁকীসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট কাঁকড়া প্রকাশ্যেই কেনাবেচা হচ্ছে। জেলেরা সুন্দরবন থেকে কাঁকড়া ধরে এনে লোকালয়ে বিক্রি করছেন এবং হ্যাচারি মালিকেরা সেগুলো কিনে নিচ্ছেন।
দাতিনাখালীর জেলে আবুল হোসেন বলেন, জেলেরা দিনের পর দিন ছোট কাঁকড়া ধরে আনছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সুন্দরবনে কাঁকড়ার সংকট তৈরি হতে পারে। একাংশের অভিমত, ছোট কাঁকড়া আহরণ বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান প্রয়োজন।
উপকূলের অর্থনীতি
শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় কাঁকড়া আহরণ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের জীবিকা। জেলে, আড়ৎদার, ব্যবসায়ী ও হ্যাচারি মালিকরা এই বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত।
স্থানীয় আবদুল্লাহ, ওয়েসকুনী ও মিলন হোসেন বলেন, সুন্দরবনের কাঁকড়ার দেশ-বিদেশে চাহিদা রয়েছে। উপকূলীয় এলাকার অর্থনীতিতেও এর প্রভাব রয়েছে। তাদের মতে, অল্প সময়ের বেশি লাভের আশায় ছোট কাঁকড়া আহরণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কাঁকড়ার উৎপাদন ও ব্যবসা দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কাঁকড়ার ভবিষ্যৎ কী
বাড়তি দামের কারণে যদি নিয়মিতভাবে কম ওজনের কাঁকড়া আহরণ বাড়তে থাকে, তাহলে কাঁকড়া সম্পদ বড় ধরনের হুমকিতে পড়তে পারে।
একদিকে, জেলেরা বলছেন, ছোট কাঁকড়ায় বেশি দাম পাওয়া যায়। অন্যদিকে হ্যাচারি মালিকরা বলছেন, ছোট কাঁকড়া দিয়ে সফটশেল উৎপাদনে লাভ বেশি। আর বন বিভাগ বলছে, ছোট কাঁকড়া আহরণ না করতে জেলেদের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে এবং নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাহলে নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ছোট কাঁকড়া নিয়মিতভাবে বাজার ও হ্যাচারিতে পৌঁছাচ্ছে কীভাবে?—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু সুন্দরবনের নদীতে জেলেদের নৌকা নয়, কাঁকড়ার পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা জেলে থেকে ক্রেতা, বাজার থেকে হ্যাচারি পর্যন্ত নজরদারির আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় গবেষকের উদ্বেগ
স্থানীয় গবেষকদের মতে, সুন্দরবনের কাঁকড়া শুধু বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রেও এর ভূমিকা রয়েছে।
সুন্দরবনের বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় দুই যুগ ধরে গবেষণা করা পিজুস বাওলীয়া পিন্টু বলেন, সুন্দরবনের কাঁকড়া বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রাণিকুলের একটি অংশ। সুন্দরবনে গাছের পাতা, খড় ও বিভিন্ন জৈব উপাদান এসে জমা হয় এবং পানির সঙ্গে ভেসে আসে। কাঁকড়া এসব উপাদান কেটে ছোট করে দেয়, যা পরে মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার উপযোগী হয়। প্রায় দশ বছর আগেও উপকূলীয় বাজারে সাধারণত ১৪০-১৫০ গ্রামের বেশি ওজনের কাঁকড়া বাজারজাত হতো এবং ছোট কাঁকড়া জেলেরা ছেড়ে দিতেন। কিন্তু উপকূলীয় এলাকায় সফটশেল বা নরম কাঁকড়ার হ্যাচারি গড়ে ওঠার পর ছোট কাঁকড়ার চাহিদা বেড়েছে। বন আইনে ছোট কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এখন সুন্দরবন থেকে বড় কাঁকড়ার পাশাপাশি ছোট কাঁকড়াও ধরে আনা হচ্ছে, যার বড় একটি অংশ হ্যাচারিতে যাচ্ছে। এভাবে ছোট কাঁকড়া আহরণ অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনে কাঁকড়ার সংকট তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, অনেক সময় দাবি করা হয় এসব কাঁকড়া নোয়াখালী, রামপালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসে। কিন্তু কাঁকড়ার প্রকৃত উৎস সুন্দরবন।
কর্মকর্তারা যা বললেন
সহকারী কর্মকর্তা ইরফান উদ্দীন বলেন, ‘জেলেরা যাতে ছোট কাঁকড়া আহরণ না করে, সে বিষয়ে তাদের বলা হচ্ছে। কিন্তু এরপরও কেউ কেউ চুরি করে ছোট কাঁকড়া আহরণ করছে। আমরা প্রতিটি ক্যাম্পে বিষয়টি দেখবো। এমন হলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
শ্যামনগর উপজেলা সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার তৌহিদ হাসান বলেন, ‘সুন্দরবনের কাঁকড়া সংক্রান্ত আইন আছে, কিন্তু ছোট কাঁকড়ার বিষয়ে আমাদের আইনে কিছু বলা নেই। তবে ছোট কাঁকড়া আহরণ করলে এক সময় সুন্দরবনে কাঁকড়া সংকট হবে।’