সু্বর্ণভূমি ডেস্ক
মধ্য গাজার একটি বাজার। চারদিকে অন্ধকার। বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এখানে দৈনন্দিন ঘটনা। সেই অন্ধকারের মাঝেই একটি উজ্জ্বল পর্দা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েক ডজন মানুষ। তাদের চোখ পর্দায়, চলছে বিশ্বকাপের ম্যাচ।
সোমবার বেলজিয়াম ও মিসরের ম্যাচ দেখছিলেন তারা। গাজার ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেরই প্রিয় খেলোয়াড় মিসরের তারকা ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ সালাহ। তাই ম্যাচটি নিয়ে আগ্রহও ছিল বেশি।
ম্যাচটি ১–১ গোলে ড্র হলেও সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি। কেউ বন্ধুর কাঁধে চড়ে বসেছেন, কেউ উড়িয়েছেন বিশাল মিসরীয় পতাকা।
ম্যাচটি দেখা হচ্ছিল নুসেইরাত এলাকার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধের ক্ষত এখনো স্পষ্ট গাজাজুড়ে। তবু বিশ্বকাপ এলে ফুটবলপ্রেমীরা সুযোগ খুঁজে নেন।
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা মুস্তাফা সিয়াম বলেন, ‘গাজার মানুষের কাছে বিশ্বকাপ কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। ফুটবলপ্রেমীরা ম্যাচ দেখার চেষ্টা করবে, অন্তত কিছু সময়ের জন্য নিজেদের দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকার জন্য।’
গাজার বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠা ছোট ছোট অস্থায়ী ক্যাফেগুলোও সেই সুযোগ করে দিচ্ছে। যুদ্ধের আগে বড় টুর্নামেন্টে যেমন পরিবেশ থাকত, যতটা সম্ভব সেটি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন ক্যাফে মালিকেরা।
মধ্য গাজার আল-জাওয়াইদা এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি শিবিরে ছোট্ট একটি টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে ম্যাচ। বালুর ওপর রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে দর্শকেরা খেলা দেখছেন। পাশে পুরোনো জেনারেটরের একটানা শব্দ।
সেখানকার এক দর্শক ঈদ আল-আত্তার বললেন, ‘আমরা যতটা সম্ভব বিশ্বকাপের আবহ উপভোগ করার চেষ্টা করি। ছোট-বড় সবাই এই টুর্নামেন্ট ভালোবাসে।’
এরপরই আক্ষেপের সুর, ‘কখনো কি স্টেডিয়ামে বসে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ কিংবা কোনো ম্যাচ দেখার সুযোগ হবে? এটা তো সব ফুটবলপ্রেমীর স্বপ্ন। কিন্তু গাজায় আমাদের জন্য সেটা প্রায় অসম্ভব।’
গত অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলো এখনো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েল। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া খুব কম মানুষই গাজা ছাড়তে পারেন।
গাজা সিটির ২৭ বছর বয়সী মাজেন আল-ঘুল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখেছেন একধরনের কষ্ট নিয়ে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের মানুষ জীবন উপভোগ করছে। আর আমাদের ঘর নেই, স্কুল নেই, এমনকি খেলা দেখার মতো নিয়মিত বিদ্যুৎও নেই।’
অনেকেই স্মরণ করেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কথা। তখন গাজা সিটির ফিলিস্তিন স্টেডিয়াম ও ইয়ারমুক স্টেডিয়ামে বড় পর্দা বসানো হয়েছিল। সন্ধ্যার ম্যাচগুলো দেখতে হাজারো মানুষ জড়ো হতেন সেখানে।
এখন সেই দৃশ্য আর নেই। কয়েকটি সমুদ্রতীরের ছোট ক্যাফেতে খেলা দেখানো হয় বটে, কিন্তু পুরোনো জেনারেটর প্রায়ই বিকল হয়ে যায়। বিদ্যুৎ চলে গেলে দর্শকেরা হতাশ হয়ে অপেক্ষা করেন, কখন আবার খেলা দেখা যাবে।
যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে গেছে এমন অনেক রেস্তোরাঁ ও আড্ডাস্থল, যেখানে একসময় ফুটবল দেখা ছিল নিয়মিত ঘটনা। এখন তাঁবুতে বসবাস করা ৩০ বছর বয়সী মারওয়ান আল-শেখ মনে করেন সেই দিনগুলোর কথা, ‘বন্ধুদের সঙ্গে গাজার জনপ্রিয় ক্যাফেগুলোতে বসে বিশ্বকাপ দেখতাম, তখন আমরা সুখী ছিলাম।
এখন আর সেই অনুভূতি নেই। একটা তাঁবুর ভেতর বানানো ক্যাফেতে বসে খেলা দেখি। আজ আমরা দুর্দশার মধ্যে আছি। শুধু ফুটবল নয়, পুরো পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গেছে।’
তবু ফুটবল থেমে নেই
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের এক সৈকতে চলছে আরেক ধরনের ‘বিশ্বকাপ’। খালি পায়ে কিংবা পুরোনো জুতা পরে তরুণেরা বালুর মাঠে খেলছেন ফুটবল। স্বেচ্ছাসেবী কোচেরা তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। কোচ মোহাম্মদ আবু তাহর ভাষায়, ‘ফুটবলই জীবনের একমাত্র মুক্তির পথ।’
তার সহকর্মী জাবের আল-বাসিতি বলেন, ‘আমাদের নিজেদের বিশ্বকাপ শুরু হয় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। চারপাশে কষ্ট, ক্ষত আর অভাব।’
খেলোয়াড়দের মধ্যে কেউ কেউ অঙ্গহানি নিয়ে খেলছেন। মাঠ নেই, সরঞ্জামেরও অভাব। তবু দর্শকের অভাব নেই। ভাঙা কংক্রিটের টুকরার ওপর বসে মানুষ খেলা দেখছেন।
যুদ্ধ গাজার মানুষের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কেড়ে নিতে পারেনি। বিশ্বকাপের আলো তাই এখনো পৌঁছে যায় অন্ধকারে ডুবে থাকা গাজার কোনায় কোনায়।