এম জুবায়ের মাহমুদ
, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
খোলপেটুয়া নদীর তীরঘেঁষা বিড়ালাক্ষী কুনের বাগান একসময় ছিল উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়াল। ঘন সবুজে আচ্ছাদিত এই বাগান ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের সময় নদীতীর রক্ষায় কমাতো বাতাসের তীব্রতা।
স্থানীয়রা জানায়, দিনের বেলাতেও যেখানে একা চলাচল করতে ভয় লাগতো, সেই বাগান এখন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে বিরাণভূমিতে।
নদীপথে কার্গোতে আনা বালু ওইসব গাছের গোড়ায় স্তূপ করে রাখার পর একের পর এক গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। পরে সেই গাছ কেটে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
১৩ মে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের শেখপাড়া ও সরদারপাড়া এলাকার মাঝ দিয়ে বিস্তৃত প্রায় ৫০০ বিঘা জায়গা জুড়ে থাকা বাগানের বড় অংশ এখন পরিণত হয়েছে ধূ ধূ মাঠে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজে ব্যবহারের জন্য নদীপথে আনা বালু প্রথমে বাগানের ভেতরে ফেলা হচ্ছে। মাসের পর মাস গাছের গোড়ায় বালু জমে থাকায় শিকড়ে স্বাভাবিক বাতাস ও পানি চলাচল বন্ধ হয়ে গাছগুলো ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। মারা যাওয়া গাছ কেটে ফেলার পর পড়ে আছে শুধু গুঁড়ি। কোথাও কোথাও গাছ গোড়াসহ তুলে নেওয়ার চিহ্নও দেখা গেছে। পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে কাটা গাছের গোড়া, শুকনো কিছু ডালপালা।
বাগানের যেসব অংশে এখনও কিছু গাছ টিকে আছে, সেখানেও গাছের গোড়া ঘেঁষে খনন করা হয়েছে অসংখ্য গর্ত। কোথাও ১২ থেকে ১৫ ফুট লম্বা করে ২-৩ ফুট মাটি কেটে নিচু করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পানি আটকে রেখে মাছের পোনা আহরণের জন্য এসব গর্ত তৈরি করা হয়েছে। এতে গাছের শিকড় আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক স্থানে গাছের গোড়ার চারপাশ পুরোপুরি কেটে ফেলায় মাটি আলগা হয়ে গাছ উপড়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাগানের ভেতরে বালু রাখার কাজ করছে খুলনার আমিন কর্পোরেশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়দের অভিযোগ, জায়গা সংকটের অজুহাতে গাছের গোড়ায় বালু ডাম্পিং করা হলেও পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি একেবারেই উপেক্ষা করা হচ্ছে।
তবে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আজমল হোসেন জানান, জায়গা না পেয়ে এখানে করছি আর বেশিদিন নেই।
বাগানের ভেতরে শামুক কুড়াতে আসা রাসিদা খাতুন বলেন, আগে এই বাগানের এক পাশ থেকে আরেক পাশ দেখা যেতো না। এখন বালু ফেলে গাছ মেরে ফেলা হচ্ছে। পরে আবার সেই গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে।
বিড়ালাক্ষী এলাকার আরিফুল ইসলাম বলেন, একসময় এই বাগানে ঢুকতে ভয় লাগতো। এখন দূর থেকেই ভেতরটা দেখা যায়। যেদিকে তাকাই শুধু কাটা গাছের গুঁড়ি।
শেখপাড়া এলাকার শেখ মজিবুর রহমান ও তার ছেলে আবুল হাসান গাছ বিক্রি ও জায়গা ভাড়া দিয়েছে। সরদারপাড়ার রোকেয়া, ইদ্রিস আলী ও আমেনাসহ কয়েকজনের কাছে শতাধিক গাছ প্রতিটি দুই থেকে তিন হাজার টাকা মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। এছাড়া শেখপাড়া এলাকার লুৎফার রহমান শেখের কাছে গাছের গোড়ায় পুকুর কেটে মাছের পোনা আহরণের জন্য এক বছরের চুক্তিতে ৬০ হাজার টাকায় জায়গা ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জুলকার নাঈম বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের একাধিকবার বলা হয়েছে গাছের গোড়ায় বালু না ফেলতে। কিন্তু তারা কোনো গুরুত্ব দেননি। উল্টো ঠিকাদারদের সঙ্গেই তাদের বেশি সময় দেখা যায়।
গাছ বিক্রি ও জায়গা ভাড়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি শেখ মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, গাছ বিক্রি ও জায়গা ভাড়ার টাকা মসজিদের কাজে দেওয়া হয়। নদীর চরের জায়গা ভাড়া ও গাছ এভাবে বিক্রির বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়েই কাজ করা হচ্ছে।
আটুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সালেহ বাবু বলেন, আমার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি এবং অনুমতি কি আমি দিতে পারি- অনুমতি দেওয়ার এমন কোনো প্রশ্নই আসে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সুমন রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, ঠিকাদারদের গাছের গোড়া থেকে বালু সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। তবে, স্থানীয়দের অভিযোগ- বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
শ্যামনগর সামাজিক বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জার আওছাফুর রহমান বলেন, ‘এলাকাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় হওয়ায় মূল দায়িত্ব তাদের। তারপরও আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।’
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে একাধিকবার কল করলেও রিসিভ করেননি।