জহর দফাদার
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি), এসএসসি, এইচএসসি এমনকী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা- সবখানেই দুর্দান্ত ফলাফল করেছেন যশোরের মেয়ে ফারহানা সুলতানা ঐশি।
অদম্য মেধাবী ঐশি তার ধারাবাহিক সফলতার ছাপ এবারও রেখেছেন। গুচ্ছভুক্ত (জিএসটি) ২০টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার ব্যবসায় অনুষদভুক্ত ‘সি’ ইউনিটে তিনি সর্বোচ্চ নম্বর (৮৫) পেয়ে প্রথম হয়েছেন।
ফলাফল প্রকাশের পর সোমবার বিকেলে কথা হয় ফারহানা সুলতানা ঐশির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি অ্যাকাউন্টিংয়ে, সেখানেই পড়তে চাই। ভবিষ্যতে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট-(সিএ) হয়ে দেশসেবা করার ইচ্ছে আমার।’
যশোর সদরের নওয়াপড়া ইউনিয়নের শেখহাটি তরফ নওয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মেহেদী হাসান ও রাফেজা খাতুন দম্পতির একমাত্র সন্তান ফারহানা সুলতানা ঐশি। শুধুমাত্র লেখাপড়াকেই ধ্যান-জ্ঞান করা ঐশি তার শিক্ষাজীবনে ধারাবাহিকভাবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
২০১৭ সালে নিজের এলাকায় থাকা আইইডিবি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। সেখান থেকেই পিইসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পান। এরপর ভর্তি হন শেখহাটি শফিয়ার রহমান মডেল অ্যাকাডেমিতে। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে সেবার জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট- জেএসসি পরীক্ষা হয়নি। ২০২৩ সালে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণের পাশাপাশি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। এরপর ভর্তি হন যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ে। এইচএসসি পরীক্ষায় এখান থেকে জিপিএ-৫, একইসাথে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। যশোর শিক্ষাবোর্ডে তিনি তৃতীয় স্থান অধিকার করেন।
এইচএসসি পাস করার পর শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ঐশিকে সর্বপ্রকার রসদ সরবরাহ করেন যশোর শহরের একটি কোচিং সেন্টারের (প্যারাগন) পরিচালক বাকী বিল্লাহ।
ঐশির ভাষায়, ‘‘বাকী বিল্লাহ স্যার আমাকে একটা বইও কিনতে দেননি, টাকা-পয়সাও নিতেন না। এমনকী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্যে রেজিস্ট্রেশন করার সময়ও বলতেন, ‘তোমার আসা লাগবে না।’’
শুধুমাত্র গুচ্ছভুক্ত (জিএসটি) ২০টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম, তাই নয়। ঐশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় হন ৮০তম এবং ‘বি’ ইউনিটে ১৬তম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ই’ ইউনিটে তৃতীয় স্থান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বি’ ইউনিটেও প্রথম স্থান অধিকার করেন।
ঐশির বাবা যশোর শহরের একটি কাপড়ের দোকানের কর্মী, মা গৃহিণী। তাদের যৌথ পরিবার। দাদি ফরিদা বেগমই তাকে পঞ্চম শ্রেণি থেকে এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে নিয়ে যেতেন। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় কখনো চাচা ইবনে হাসান রবিন, খালা রাবেয়া আক্তার এবং কোচিং শিক্ষক বাকী বিল্লাহ গেছেন সাথে।
সাড়ে চার কাঠা জমির ওপর একতলা বাড়ির বড় দুই রুমে বাবা ও চাচা পরিবার নিয়ে থাকেন। আলাপচারিতায় ঐশি জানান, তার এই সাফল্যের পেছনে যাদের সবচেয়ে বেশি অবদান- তারা হলেন তার মা, দাদি, খালা, কাকা। তাছাড়া, শিক্ষকদের মধ্যে এমএম কলেজের বাংলা বিভাগের রেহমান আজিজ তাকে অনেক সহযোগিতা ও আত্মবিশ্বাসী করেছেন। তাছাড়া বিএএফ শাহীন কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সাইমিনা খাতুনও অনেক সহযোগিতা করেছেন।
তিনি স্মৃতি হাতড়ে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটের পরীক্ষার আগে টাকা-পয়সার বেশ সঙ্কট ছিল, ভেবেছিলাম পরীক্ষা দেবো না। কিন্তু আমাদের কলেজের এক বড়ভাই কীভাবে যেন জানতে পারেন এবং তিনি আমার বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দেন। আসলে টাকা-পয়সার সঙ্কট থাকলেও পড়াশোনার ক্ষেত্রে কীভাবে যেন সব জোগাড় হয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, ‘যেসব দরিদ্র ছেলেমেয়ে পড়াশুনা করতে চায়, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়- তাদের জন্যে ভবিষ্যতে কিছু করার একটা ইচ্ছা আমি লালন করি। আপনারা শুধু দোয়া করবেন।’
ঐশির বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর সরকারি এমএম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক রেহমান আজিজ বলেন, ‘সে খুবই মেধাবী। এই মেয়েটা যেখানে পরীক্ষা দিয়েছে, সেখানেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। আমি তার সর্বাঙ্গীন কল্যাণ ও সফলতা কামনা করছি।’