বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
যশোরের চৌগাছা উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম মুক্তারপুর। এই গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। একসময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এই নদে নেই আগের সেই স্রোতধারা। খনন হয়, কিন্তু জোয়ারভাটা খেলে না।
কিন্তু এই অজপাড়াগাঁয়ে একজন সচিবের প্রচেষ্টায় ৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন পার্ক। যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, এটি কপোতাক্ষ নদের প্রতিরক্ষা কাজ।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের (২য় পর্যায়) আওতায় চৌগাছা উপজেলার ধুলিয়ানী ইউনিয়নের মুক্তারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে কপোতাক্ষ নদের বামতীরে শূন্য দশমিক পাঁচ কিমি প্রতিরক্ষা কাজ।
কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, কপোতাক্ষের তীরে বাঁধের (ব্লক দিয়ে) পাশাপাশি প্রায় চার বিঘা জমির উপরে তৈরি করা হয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন পার্ক। অসম্পূর্ণ এই পার্ক, তবুও এসেছে অনেক মানুষ। এর পাশেই মুক্তারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
মুক্তারপুর গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কপোতাক্ষের পাড়ে এই জায়গায় এক একর ৩৬ শতক খাসজমি রয়েছে। সেখানে একসময় গুচ্ছগ্রাম হওয়ার কথা চলছিল। কিন্তু নদের পাড়ে সেই গুচ্ছগ্রাম টিকবে না বিধায় সেটি আর করা হয়নি। পরে এই গ্রামের বাসিন্দা, রাশেদুল ইসলাম নামে একজন সচিবের প্রচেষ্টায় স্থানীয়দের মানসিক উৎকর্ষ সাধনে নদের তীরে একটি বিনোদন কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা বীরমুক্তিযোদ্ধা রবিউল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আলাউদ্দিন, দাউদ হোসেন প্রমুখ জানান, মুক্তারপুর গ্রামের একটি ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের আগে মুক্তারপুর প্রাইমারি স্কুল মাঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এসেছিলেন, জনসভায় বক্তব্য দেন।
সেই মিটিংয়ে থাকা প্রায় ৯০ বছর বয়সী দাউদ হোসেন বলেন, আমি তখন সিক্স কিংবা সেভেনে পড়ি। বঙ্গবন্ধু এই স্কুল মাঠে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। কী কী বলেছিলেন সব কথা মনে নেই। কিন্তু, জনসভাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যদের দেখিয়ে তিনি বলেন- ‘কিছুদিন আগে জেল খেটে বের হলাম, এরা হয়তো আবার আমাকে ধরে জেলে দেবে।’
স্থানীয়রা বলেন, মুক্তারপুরে নির্বাচনি জনসভার অন্যতম উদ্যোক্তা সিংহঝুলি ইউনিয়ন বোর্ডের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও ঝিকরগাছা থানা আওয়ামী লীগের সম্পাদক সামসুজ্জোহা ওরফে ভাটাই বিশ্বাস। সাবেক সচিব রাশেদুল ইসলাম হলেন সামসুজ্জোহা ওরফে ভাটাই বিশ্বাসের ছোট ছেলে।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার সন্তান কপোতাক্ষ গেজেট-এর সম্পাদক এম মুজাহিদ আলী মুক্তারপুরের সেই জনসভার বিষয়ে তার নিবন্ধ ‘জনদরদী নেতৃত্বের নাম সামসুজ্জোহা ভাটাই বিশ্বাস’ শীর্ষক লেখায় বলছেন, ‘ ... একটি ট্রাক, শত শত বাইসাইকেল, অগণিত গরুরগাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি এবং নৌকাযোগে যথাসময়ে মুক্তারপুর স্কুল মাঠে জমায়েত হলেন কৃষক, ছাত্র-জনতা। জনতার ঢল উপচে পড়া ভিড়ে নিঝুম নিভৃত মুক্তারপুর মুহূর্তে প্রাণচঞ্চলতায় ভরে উঠল।... সকালে শহীদ মশিউর রহমানের গ্রামের বাড়ি সিংহঝুলি থেকে বঙ্গবন্ধু ও মশিউর রহমান দুইটা বাইসাইকেলে উপস্থিত হলেন মুক্তারপুর ভাটাই বিশ্বাসের বাড়িতে। নাশতা ও খাওয়া শেষে স্কুল মাঠের মঞ্চে উঠে গেলেন উভয় নেতা। স্কুল মাঠ কপোতাক্ষ নদের পাড়। জনসভার সংবাদে চৌগাছা, ঝিকরগাছা এবং শার্শা এলাকায় বাঁধভাঙ্গা আনন্দের হিল্লোল, সাথে মুক্তারপুর এবং ভাটাই বিশ্বাসের ইউনিয়নের ৩২ গ্রামের অধিবাসী ও পাশ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার জনগণ...’
পার্কের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সচিব রাশেদুল ইসলাম বলেন, মুক্তারপুর গ্রামের মানুষের চিত্ত বিনোদনের জন্যেই মূলত কপোতাক্ষের পারে ওয়াকওয়ে এবং একটি পার্কের জন্যে আমি পাউবোর সাথে কথা বলেছিলাম। এতে আমার প্রচেষ্টা ছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল, এখানকার ছেলেমেয়ে ও সাধারণ মানুষ যেন বিকেলে নদের পাড়ে বেড়াতে পারে; তাদের মানসিক বিকাশ হয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে করেছিমাত্র।
এই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আরিফ হোসেন বিপুল জানান, প্রকল্পের কাজ শেষের দিকে। মাসখানেকের মধ্যে এটি হস্তান্তর করা হতে পারে।
জানতে চাইলে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে। এখন বাকি রয়েছে দুটি ঘাট। আমরা এখানে দুইটি ফাংশন করেছি- একটি নদের তীরে ভাঙনরোধ অপরটি সৌন্দর্যবর্ধন। পানি উন্নয়ন বোর্ড আসলে পার্ক করে না, নদের তীরে ভাঙনরোধে প্রতিরক্ষা কাজ করা হয়েছে। এরপর বাজেট থেকে ওয়াকওয়ে ও কিছুটা সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ, নদের পাড়ে বসার ব্যবস্থা ইত্যাদি। এখন যদি সেখানে বৃক্ষ রোপণ করতে হয়, সেটি উপজেলা বা জেলা পরিষদ করবে।