যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

দুইশ’ বছরের প্রাচীন দয়ারামপুরের ঈদগাহ

জহর দফাদার

, যশোর

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ,২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
দুইশ’ বছরের প্রাচীন দয়ারামপুরের ঈদগাহ

দয়ারামপুরের ঈদগাহটি দেখলেই প্রশান্তিতে মন ভরে যায়। এই ঈদগাহটি যশোর জেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। ১৮১০ সালের দিকে এই ঈদগাহের প্রতিষ্ঠাকাল দাবি করা হলেও এর সপক্ষে কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।

ঈদগাহের প্রতিষ্ঠাতা ও তার ছেলেকে নিয়ে এই এলাকার মানুষের মাঝে নানা ধরনের বিশ্বাস ও লোকতকাহিনি প্রচলিত রয়েছে।

ঐতিহাসিক শেরশাহ সড়কের পাশে প্রায় দুইশ’ বছরের ঐতিহ্য যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার দয়ারামপুর ঈদগাহ।

এই ঈদগাহের বিস্তৃত জায়গাজুড়ে রয়েছে সারি সারি গাছ। এখানে ছায়া সুনিবিড় পরিবেশে হাজার দশেক মুসল্লি একসঙ্গে আদায় করতে পারেন ঈদের নামাজ।

বাঘারপাড়া সদর থেকে প্রায় সাত কিমি আর নারিকেলবাড়ীয়া বাজার থেকে প্রায় এক কিমি দূরে অবস্থান এই প্রাচীন ঈদগাহের। প্রায় তিন বিঘা (১০০ শতক) জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে ঈদগাহটি। এর উত্তরপাশে দয়ারামপুর সিদ্দিকীয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা, পূর্বপাশে একটি মসজিদ আর পশ্চিমপাশে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং এই দুই প্রতিষ্ঠানের মাঝ বরাবর চলে গেছে শেরশাহ সড়ক* (শেরশাহ সড়ক : ১৫৪১ থেকে ১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ২৫শ’ কিমি রাস্তা তৈরি করেন তৎকালীন দিল্লির অধিপতি শেরশাহ। সেইসময়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে যশোরের উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া হয়ে পাকিস্তানের পেশোয়ারের মধ্য দিয়ে এ রাস্তাটি সুদূর কাবুল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এ সড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে ব্যবহার করলেও বাংলাদেশের অনেক স্থানে এর কোনো চিহ্ন নেই। অস্তিত্ব রয়েছে কেবলমাত্র যশোরের বাঘারপাড়ায়)।

স্থানীয়রা জানান, নারিকেলবাড়ীয়া-লাগোয়া মাগুরার শালিখা উপজেলার কাদিরপাড়া, গোবরা, হরিশপুর, দেয়াভাঙ্গা, হাজরাহাটি, ঝুনোরি, শতখালী, বাঘারপাড়ার ধলগ্রাম, বন্দবিলা ও নারকেলবাড়ীয়া ইউনিয়ন এবং নড়াইলের প্রায় ৩০ গ্রামের দশ সহস্রাধিক মানুষ এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

ঈদগাহ-লাগোয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আশরাফউদ্দিন। জীবদ্দশায় তিনি এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, ১৮১০ সালের দিকে তার দাদা পীর ইউসুফ (রা.) এই ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকে অদ্যাবধি ব্যাপক আয়োজনে ঈদের জামাত হয়ে আসছে এখানে। সেইসময় ঈদগাহের জায়গা অনেকখানি ছিল। তখন আশপাশের ৩০ গ্রামের মানুষ এখানে ঈদের জামাতে অংশ নিতেন।

আশরাফউদ্দিনের ছোটভাই মুফতি মাওলানা ইমাদউদ্দিন জানান, তার দাদা প্রথম দিকে ঈদের নামাজে ইমামতি করতেন। তার মৃত্যুর পর বড় ছেলে পীরজাদা আব্দুর রহিম ইমামতি করেছেন। তার ইন্তেকালের পর ইমামতির দায়িত্ব পান আব্দুর রহিমের ছেলে মাওলানা শামসুদ্দিন। প্রায় ৩০ বছর মাওলানা শামসুদ্দিন ইমামতি করেছেন। তার ইন্তেকালের পর থেকে ইমামতির দায়িত্বে রয়েছেন ছোটভাই মুফতি মাওলানা ইমাদউদ্দিন। ঈদগাহের সামান্য দূরে পীরবাড়িতে থাকেন তিনি।

এখানকার পীরবাড়ির অনেক ঐতিহ্য রয়েছে। কামেল হিসেবে তাদের নাম-ডাক আছে। পীরবাড়ির সদস্যদের নিয়ে মানুষের মুখে মুখে বেশকিছু আশ্চর্যজনক ঘটনা কথা শোনা যায়। এখনও মানুষ সেইসব ঘটনা বিবৃত করেন।

দয়ারামপুর সিদ্দিকীয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. ইয়াহিয়া আলী বলেন, ‘এখানকার পীররা ছিলেন খুবই আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী। আমাদের নিজেদের জীবনেও তাদের মোজেজা দেখেছি।’

তিনি বলেন, ‘‘আমার আম্মার একসময় মুখ বেঁকে গিয়েছিল। তখন আব্বা পীরসাহেবের (পীরজাদা আব্দুর রহিম) কাছে গিয়েছিলেন। পীরসাহেব আব্বাকে বাজার থেকে একটা লাউ আর কিছু জিয়েল (শিং) মাছ আনতে বলেন। অসময়ে কোথায় লাউ পাবেন- জিজ্ঞেস করতেই পীরসাহেব বলেন, ‘হাটে যাও।’ আব্বা হাটে গিয়ে একটা সুন্দর লাউ পান, কিছু জিয়েল মাছও কিনে পীরসাহেবের কাছে নিয়ে যান। পীরসাহেব লাউ ‘পড়ে’ দেন, বাড়ি এসে রান্না করে আম্মাকে খাওয়ালে তার মুখ ঠিক হয়ে গিয়েছিল।”

নারিকেলবাড়ীয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বাবলু কুমার সাহার ভাষ্য, এই ঈদগাহ নির্মাণে পীরদের অনেক অবদান। প্রতিবছর এই ঈদগাহে হাজার হাজার মানুষ জামাতে নামাজ আদায় করেন। একসময় এই ঈদগাহে শবেবরাতের সময় ওয়াজ মাহফিল হতো। সেখানে ব্যাপক আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকতো।

পীরদের অত্যাশ্চর্য কিছু ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘তিনি (পীরসাহেব ইউসুফ) ভারতের ফুরফুরা শরিফের সিলসিলার অনুসারী ছিলেন। তখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। একবার ফুরফুরা শরিফে বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে অসুস্থতার কারণে পীরসাহেব ইউসুফ (রা.) যেতে পারেননি। ফুরফুরা শরিফের পীরসাহেব তার ওয়াজ শেষে যখন নামাজের ওয়াক্ত, তখন সবাইকে কাতার সোজা করে দাঁড়াতে বলেন। একইসাথে ঘোষণা দিলেন, ‘আপনারা সবাই কাতারে দাঁড়ান, পূর্বপাকিস্তান থেকে ইউসুফ আসছেন, উনি আপনাদের ইমামতি করবেন।’ যারা জানতেন অসুস্থতার কারণে পীরসাহেব এবার মাহফিলে যেতে পারেননি, তারা বেশ আশ্চর্য হন। কিন্তু সবাইকে আরও বেশি আশ্চর্য হতে হয়েছিল, সেই নামাজে ইমামতি করেছিলেন পীরসাহেব ইউসুফ (রা.)।’’

স্থানীয়দের মুখে মুখে আরেকটি কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। একবার পীরজাদা আব্দুর রহিমের কাছে কয়েকজন মুরিদ আসেন ‘দাওয়া’ নিতে। তখন প্রয়োজন হয়ে পড়ে খাঁটি মধুর। কিন্তু মুরিদরা মধু পাচ্ছিলেন না। সেসময় তিনি মুরিদদের উদ্দেশ করে বলেন, একটি বাটি নিয়ে অদূরে থাকা একটি গাছের নিচে দাঁড়াতে। কিছু সময় পর ওইগাছে থাকা একটি মৌচাক থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে থাকে মধু!

বোধবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে নামাজ আদায় করে আসছেন দয়ারামপুর এলাকার বাসিন্দা প্রবাসী শাহিন আলম। তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদাও এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। আমরাও আদায় করি। অনেক মানুষ হয় ঈদের জামাতে।’

জয়পুরের বাসিন্দা ইমদাদ হোসেন জানান, প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি এখানে নামাজ আদায় করেন। তার কাছে মনে হয়, যেন তিনি শোলাকিয়ার জামাতে নামাজ আদায় করছেন। নারিকেলবাড়ীয়া ইউনিয়নে ১৪টি গ্রাম। এই গ্রামগুলোর মুসল্লিরা তো আছেনই; বাইরের মাগুরা জেলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও বহু মানুষ আসেন ঈদের জামাতে।

স্থানীয় ও পীরবাড়ি সূত্রে জানা যায়, ঈদগাহের জন্যে জমি বরাদ্দ দেন সেই সময়কার বিশিষ্ট সমাজসেবী রাজেন্দ্রনাথ সাহা। তার দেওয়া জমির পরিমাণ ৩৩ শতক। স্থানীয় আরেক সমাজসেবী রহিম বক্স দেন ২৪ শতক এবং পীরসাহেব ইউসুফ (রা.) দান করেন ৪৩ শতক জমি।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)