সম্পাদকীয়
ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পটি সর্বজন প্রশংসিত। কিন্তু যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রোহিতা ইউনিয়নে নির্মিত নয়টি ঘর প্রায় দেড় বছর ধরে তালাবদ্ধ থাকার ঘটনা প্রকল্পটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ‘হস্তান্তর না হওয়া আশ্রয়ণের ঘরে মাদকের আখড়া’ শিরোনামটি যতটা না উদ্বেগজনক, তার চেয়েও হতাশার বিষয় হলো ভূমিহীন মানুষেরা এখনও অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন, অথচ তাদের জন্য নির্মিত ঘরগুলোয় চলছে মাদকসেবীদের আড্ডা।
২০২৪ সালের শেষের দিকে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও কেন ঘরগুলো হস্তান্তর করা হয়নি, তা আজও রহস্য। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিজেই স্বীকার করেছেন, বিষয়টি তার কাছে ‘স্পষ্ট না’। অথচ ইউনিয়ন ভূমি অফিস দাবি করছে, তারা ইতিমধ্যে ১২ জন ভূমিহীনের তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে। এই তথ্য ও বক্তব্য বলে দিচ্ছে, এখানে সমন্বয়হীনতাই হলো মূল সমস্যা।
সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘরগুলোর তালা ভেঙে সেখানে মাদকসেবীরা আখড়া গড়ে তুলেছে। একটি ঘর পশুখাদ্যে ভর্তি, অন্যটির বারান্দায় জ্বালানির স্তূপ। টয়লেটগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী। সরকারি সম্পদে এই অনাচার কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্থানীয় ইউপি সদস্যের বক্তব্যে স্পষ্ট, রাত হলে এলাকাবাসী ওই মোড়ে যেতে ভয় পান। একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর যখন এলাকার জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দেওয়ার উপক্রম হয়।
অবশ্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতদিন এই অবহেলা কেন? প্রকৃত ভূমিহীনদের তালিকা করে তাদের হাতে ঘর তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কেন দীর্ঘসূত্রতা? প্রকল্প বাস্তবায়নে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা কি কখনও সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখেছেন? দেড় বছর ধরে ফাঁকা পড়ে থাকা ঘরগুলোর তালা ভাঙার খবর তাদের কাছে পৌঁছায়নি কেন?
এখানে একটি প্রশ্ন সঙ্গতভাবেই আসতে পারে। আর তা হলো, যেহেতু প্রকল্পটি ফ্যাসিবাদী জমানার, তাই সেখানে নানা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির মতো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। যদি পূর্ববর্তী সরকার ফ্যাসিবাদের লেজুড়দের নাম সম্ভাব্য সুবিধাভোগীর তালিকায় স্থান দিয়ে থাকে, তো তাদের নাম বাদ দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। শেখ হাসিনা তো তার নিজের জমি বিক্রি করা টাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্প করেননি। টাকা রাষ্ট্রের, চূড়ান্ত বিচারে যা জনগণের কাছ থেকেই সংগৃহীত। তাছাড়া আলোচ্য প্রকল্পটি হাসিনার আমলে শুরু হলেও ড. ইউনূসের শাসনকালে এগিয়েছে।
আমরা মনে করি, ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত ঘর তাদের প্রাপ্য। প্রান্তিক এই মানুষেরা হয়তো দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের কক্ষে সবসময় প্রবেশাধিকার পান না। তাদের আওয়াজও পৌঁছায় না রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কান পর্যন্ত। এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সুবর্ণভূমি সেই কাজটিই করার চেষ্টা করেছে। আশা করি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন।