সম্পাদকীয়
সংবাদের তথ্য-প্রমাণ চেয়ে খুবি প্রশাসনের চিঠি
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) সাম্প্রতিক এক ঘটনা বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন ও গণমাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঢাকাভিত্তিক একটি নামী দৈনিকের প্রতিনিধি এবং ওই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী মিরাজুল ইসলামের কাছে উপাচার্যের বক্তব্য ‘বিকৃত ও বিভ্রান্তিকরভাবে’ উপস্থাপনের অভিযোগ এনে ব্যাখ্যা চেয়েছে। এই চিঠি প্রেরণের পদ্ধতি ও প্রেক্ষাপট সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার- এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সংবাদ প্রতিবেদনে কোনো ভুল বা বক্তব্যের বিকৃতি ঘটে থাকলে, তা সংশোধনের জন্য প্রথম কর্তব্য হলো সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করা। সাংবাদিকতা একটি পেশা এবং এর একটি প্রতিষ্ঠানগত কাঠামো রয়েছে। সরাসরি একজন শিক্ষার্থী-সাংবাদিককে চিঠি দিয়ে অডিও-ভিডিও রেকর্ড ও তথ্যসূত্র হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া প্রশাসনিকভাবে যথাযথ নয় কি-না, তা গভীরভাবে বিবেচনা করা দরকার। বিশেষত যখন ওই সাংবাদিক আবার সেই প্রতিষ্ঠানেরই একজন শিক্ষার্থী, তখন এই পদক্ষেপকে প্রশাসনিক চাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সচিবের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রেস কাউন্সিল বলেছে, প্রতিবেদকের পাশাপাশি সম্পাদকীয় বিভাগেরও দায়িত্ব থাকে এবং ব্যাখ্যা চাইলে প্রতিষ্ঠানকেই চাওয়া উচিত। এই বক্তব্য সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। একজন সাংবাদিক তার সোর্স বা রেকর্ডিং জনসমক্ষে প্রকাশ করতে বাধ্য নন, যতক্ষণ না তা আদালতের নির্দেশে বা সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আসে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি তথ্যসূত্র না পেয়ে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেওয়ার হুমকি দেয়, তবে তা গোয়েন্দাগিরির মতো মনে হতে পারে, যা অ্যাকাডেমিক পরিবেশের জন্য মোটেও কাম্য নয়।
তৃতীয়ত, এই ঘটনা শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (খুবিসাস) যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা অমূলক নয়। শিক্ষাঙ্গনে সাংবাদিকতা মানে শুধু খবর সংগ্রহ নয়, বরং সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চাও। প্রশাসন যদি কোনো প্রতিবেদনে আপত্তি থাকে, তবে তা গঠনমূলকভাবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। কিন্তু সরাসরি হুমকি বা শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করলে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি তৈরি করবে, যা গণতন্ত্র চর্চার জন্য ক্ষতিকর।
প্রতিবেদনে উপাচার্যের বক্তব্য সঠিকভাবে প্রচারিত হয়েছে কি-না, তা যাচাই করা প্রশাসনের অধিকার, কিন্তু তার পদ্ধতি হতে হবে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক। সংবাদটির প্রতিবাদে প্রশাসনের উদ্বেগ যদি প্রকৃত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পত্রিকার সম্পাদকের কাছে সঠিক তথ্য পাঠিয়ে তারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ‘তথ্যসূত্র’ ও ‘অডিও’ দাবি করে তাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করানো প্রশাসনিক অসারতা ও স্বেচ্ছাচারিতার নিদর্শন হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তচিন্তার প্রাণকেন্দ্র, সেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। প্রশাসনের উচিত এই চিঠি প্রত্যাহার করা এবং গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে আলোচনার মধ্য দিয়ে বিষয়টির সমাধান করা। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা শুধু একটি পেশাগত অধিকার নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, যা সব পর্যায়ে রক্ষা করতে হবে।