সম্পাদকীয়
যশোর জেলা মুরগির ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এখানে উৎপাদিত ডিমের প্রায় অর্ধেক ডিম ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এই জেলায় প্রতিদিনের চাহিদা ১৮ থেকে ২০ লাখ ডিম হলেও উৎপাদন হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ। প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন সত্ত্বেও স্বাভাবিক যুক্তি বলে, অতিরিক্ত সরবরাহ থাকলে দাম কমবে কিংবা স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে যশোরে ডিমের দাম বেড়েছে হালিতে চার থেকে ছয় টাকা। এই অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধির পেছনে স্পষ্টতই কারসাজি রয়েছে কিছু বড় কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেটের।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ডিমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে হাতেগোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি। তারা প্রতিদিন সকালে রাজধানীতে বসে ডিমের দাম নির্ধারণ করে দেন। এটি সুস্পষ্ট কারসাজি, যা মুক্তবাজার অর্থনীতির মূলনীতি পরিপন্থি। চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ না হয়ে যখন কয়েকটি কর্পোরেট হাউজের স্বার্থে দাম ঠিক করা হয়, তখন ভোক্তা বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুরগির ডিম তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের একটি সাশ্রয়ী ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু এই ডিম এখন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বহুদিন ধরে এই সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকলেও কেন কোনো সরকার তা ভাঙতে পারেনি? নীতিগত সংকল্পের অভাব, দুর্বল বাজার মনিটরিং কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপ- যা-ই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের পুষ্টির অধিকারকে জিম্মি করে রাখা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে এখনই কঠোর অবস্থান নিতে হবে। বড় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে একচেটিয়া মূল্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদক ও ভোক্তার সরাসরি সংযোগ স্থাপনে উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে।
একটি সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় প্রতিযোগিতা কমিশনকে আরও সক্রিয় করতে হবে। যশোরের মতো উদ্বৃত্ত উৎপাদন হওয়া জেলায় ডিমের দাম লাফিয়ে বাড়লে সেটা কৃত্রিম সংকট ছাড়া আর কিছু নয়। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রশাসনিক ও আইনি উদ্যোগ জরুরি। না হলে সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা অপূর্ণই থেকে যাবে।