স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
মানসিক অসুস্থতার কারণে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন আনজু (৩৫)। এরপর দীর্ঘ দেড় দশক তার কোনো খোঁজ ছিল না পরিবারের কাছে। একপর্যায়ে নিজের অজান্তেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাওয়া আনজুর সন্ধান মেলে কলকাতার একটি মানসিক হাসপাতালে। দীর্ঘ চিকিৎসা, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং দুই দেশের প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে বুধবার বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে ফিরেছেন তিনি। সন্তানকে ফিরে পেয়ে সীমান্তে আবেগে ভেঙে পড়েন আনজুর মা ও স্বজনরা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে যশোরের বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে আনজুকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা আনজুকে নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
আনজুর বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার ভোমরাদহ ইউনিয়নে। তার মায়ের নাম মোছা. আনোয়ারা বেগম, মতান্তরে জোসনা বেগম। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ বছর আগে তীব্র মানসিক অসুস্থতার কারণে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন আনজু। এরপর উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে কোনো এক পর্যায়ে নিজের অজান্তেই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন তিনি।
ভারতে দীর্ঘদিন ভবঘুরে অবস্থায় থাকার পর ২০১৭ সালের দিকে কলকাতার পাবলভ মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে চিকিৎসার পর কলকাতার মানবিক সহায়তা সংস্থা 'ঈশ্বর সংকল্প' তাকে নিজেদের আশ্রয়ে নেয়। সংস্থাটি তার চিকিৎসা ও দেখভালের পাশাপাশি পরিবারের সন্ধানেও কাজ শুরু করে।
আনজুর কাছ থেকে পাওয়া বিক্ষিপ্ত তথ্যের সূত্র ধরে তার পরিবারের পরিচয় শনাক্তে কাজ করেন অ্যামেচার রেডিও সোসাইটি অব বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং রোটারি ক্লাব অব বনানী, ঢাকার সদস্য মো. শামসুল হুদা। প্রযুক্তি ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের মাধ্যমে একপর্যায়ে ঠাকুরগাঁওয়ে আনজুর পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর আনজুকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ কাজে অ্যামেচার রেডিও সোসাইটি অব বাংলাদেশ, রোটারি ক্লাব অব বনানী, ঢাকা এবং কলকাতার 'ঈশ্বর সংকল্প' সমন্বিতভাবে সহযোগিতা করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশন এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নারী ও শিশু উন্নয়ন দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক পক্ষগুলো জাতীয়তা যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করে।
দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনজুকে বাংলাদেশে ফেরানোর জন্য বিশেষ ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করা হয়। পরে বুধবার বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্টে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে।
বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে আনজুকে ভারত থেকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে তাকে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি মানবিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হস্তান্তরের সময় আনজুর মা বেনাপোল সীমান্তে উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ ১৫ বছর পর সন্তানকে সামনে পেয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং আনজুকে জড়িয়ে ধরেন। দীর্ঘদিন সন্তানকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও এ সময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
অ্যামেচার রেডিও সোসাইটি অব বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শামসুল হুদা বলেন, আনজুর কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের সূত্র ধরে প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার পরিবারের সন্ধান করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।