সম্পাদকীয়
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। কাগজে-কলমে এই বাজেট উচ্চাভিলাষী, চ্যালেঞ্জিং এবং সময়োপযোগী। তবে বাস্তবায়নের পথ যতটা মসৃণ মনে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
প্রথমত, বাজেটের আকার বাড়লেও এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয় বৈষম্য কমানো। গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক মন্দা, রপ্তানি আয়ে স্থবিরতা এবং রিজার্ভের চাপ বাজেট বাস্তবায়নে বাড়তি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। তাই বাহ্যিকভাবে রাজস্ব আদায়ের কাঠামো দুর্বল থাকলে এতো বড় বাজেট অর্থায়ন সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগ যদি অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ করা হয়, তবে তা স্বাগত। কিন্তু একইসঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ যেন অপর্যাপ্ত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। সাধারণ মানুষ যখন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে জর্জরিত, তখন সামাজিক সুরক্ষা বলয় আরও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।
তৃতীয়ত, বাজেটে নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান করের হার বৃদ্ধি করলে তা যেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে, সেদিকে সতর্ক থাকা জরুরি। করের আওতা বাড়ানো প্রয়োজন, কিন্তু উৎপাদন ব্যাহত হয় এমন কর কাঠামো অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
চতুর্থত, বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব পূর্ববর্তী বাজেটগুলোর ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ ছিল। নতুন সরকার যদি সেগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটায়, তবে বাজেটের আকার নিঃস্বার্থ জনকল্যাণের পরিবর্তে বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
সবশেষে, এই বাজেট কেবল আকারেই নয়, প্রতিশ্রুতিতেও বড়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়ানো, ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ঘটানো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ থাকা জরুরি। বাজেট যদি কেবল প্রস্তাবনাতেই চমক দেখায়, কিন্তু বাস্তবে জনমানুষের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে না পারে, তাহলে এই নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা হয়ে থাকবে আরেকটি অর্থহীন হিসাব। জনগণের আশা পূরণের দায়িত্ব এখন সরকারের কাঁধে।