সম্পাদকীয়
ভাইরাসে উজাড় বাঁধাকপির ক্ষেত
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ফসলের মাঠে কৃষকের সাফল্য শুধু একটি পরিবারের আয়-রোজগারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্থানীয় অর্থনীতি, খাদ্য সরবরাহ এবং বাজারব্যবস্থার স্থিতিশীলতা। অথচ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগবালাই, উৎপাদন উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারের অনিশ্চয়তায় কৃষককে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চাষ করতে হচ্ছে। যশোর সদর উপজেলার নোঙরপুর মাঠে আগাম বাঁধাকপি চাষিদের সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতি সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।
নোঙরপুরে আগাম জাতের বাঁধাকপিতে ভাইরাসের আক্রমণের পাশাপাশি ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরা। কয়েকজন কৃষকের পুরো জমির ফসল নষ্ট হওয়ার তথ্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। একজন কৃষক চার বিঘা জমিতে চাষ করে বীজ, জমি প্রস্তুত, চারা, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যায় প্রায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছেন। ফসল নষ্ট হওয়ার পর নতুন করে চাষ করার অর্থও তার হাতে নেই। এই পরিস্থিতি শুধু একটি মৌসুমের লোকসান নয়; এর প্রভাব একটি কৃষক পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ চাষাবাদের ওপরও পড়তে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু রোগবালাই শনাক্তকরণ, মাটি পরীক্ষা, সঠিক জাত নির্বাচন, পানি নিষ্কাশন এবং সময়মতো কৃষি পরামর্শের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থাপনা ক্ষতির মাত্রা কমাতে পারে। কৃষকদের অভিযোগ, মাটি পরীক্ষায় সমস্যা ধরা পড়লেও তা মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত ও কার্যকর পরামর্শ সবসময় পাওয়া যায় না। এই অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কৃষকের কাছে শুধু মাটি পরীক্ষার ফল পৌঁছে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; পরীক্ষার ফল অনুযায়ী কী সার ব্যবহার করতে হবে, কোন রোগের জন্য কী ব্যবস্থা নিতে হবে, কীভাবে জমির পানি নিষ্কাশন করতে হবে—এসব বিষয়ে ব্যবহারিক নির্দেশনাও দিতে হবে।
একই সঙ্গে কৃষি উপকরণের মূল্য ও বাজারদর নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সার-কীটনাশকের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অথচ সবজির বাজারদর কমে গেলে কৃষককে দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়তে হয়। কৃষকের উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে কৃষি ক্রমেই অনিশ্চিত পেশায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। তাই কৃষি উপকরণ সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজারব্যবস্থাও গড়ে তোলা জরুরি।
কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মাটি সংগ্রহ করে পরীক্ষা এবং নতুন করে চারা রোপণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে—এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর ও সমন্বিত হওয়া প্রয়োজন। রোগাক্রান্ত জমি চিহ্নিত করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করে কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে পুনঃচাষ ঋণ বা প্রণোদনার ব্যবস্থা করা দরকার।
নোঙরপুরের কৃষকদের বর্তমান সংকট তাই কেবল একটি এলাকার বাঁধাকপি চাষের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি কৃষকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা এবং বাজারব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো নতুন করে ভাবার সুযোগও তৈরি করেছে। কৃষক যাতে একবার ফসল নষ্ট হওয়ার পর চাষাবাদ থেকে ছিটকে না পড়েন, সে জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার কাঠামো প্রয়োজন।
আবহাওয়া অনুকূলে এলে নতুন করে চারা রোপণের মাধ্যমে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব—কৃষি বিভাগের এই আশাবাদ বাস্তবায়িত হোক, সেটিই প্রত্যাশা। তবে সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে কৃষকের পাশে দ্রুত, কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে; আর কৃষি টিকে থাকলেই খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।