সম্পাদকীয়
মণিরামপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, একই সঙ্গে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শিশুরাও। সুবর্ণভূমি একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য দিয়েছে।
গত ২৩ দিনে ৫৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি হামের উপসর্গ নিয়ে ২২ শিশুর ভর্তি হওয়াও জনস্বাস্থ্যের জন্য সতর্কবার্তা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর বাড়তি চাপ। সব মিলিয়ে মণিরামপুরের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, ডেঙ্গু রোগীদের বড় একটি অংশ মণিরামপুর পৌরসভার বিজয়রামপুর ও গাংড়া এলাকার বাসিন্দা বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পৌর এলাকার ময়লা-আবর্জনায় ভরা ড্রেন যদি মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়, তাহলে হাসপাতালে রোগী তো বাড়বেই।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে জরুরি হলো রোগের উৎসে আঘাত করা। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং প্রয়োজনীয় মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এ কাজে পৌরসভা, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে—হাসপাতালে ডেঙ্গু শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সব সুবিধা না থাকা। সিবিসি উইথ প্লাটিলেট পরীক্ষার রিএজেন্ট না থাকায় রোগীকে বাইরে ৪০০ টাকা খরচ করে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। একইভাবে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষাও বাইরে থেকে করাতে হচ্ছে। একজন দরিদ্র বা নিম্নআয়ের রোগীর জন্য এসব অতিরিক্ত ব্যয় চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও যদি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও স্যালাইন বাইরে থেকে কিনতে হয়, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
অবশ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩০ হাজার টাকার রিএজেন্টের অর্ডার করেছে এবং আগামী রোববার থেকে প্লাটিলেট পরীক্ষা চালুর কথা জানিয়েছে—এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু সাময়িকভাবে একটি চালান সরবরাহ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। রোগীর চাপ ও রোগের প্রকোপ বিবেচনায় নিয়মিত রিএজেন্ট, ওষুধ, স্যালাইন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
৫০ শয্যার হাসপাতালে ৩১ শয্যার লোকবল দিয়ে কখনো কখনো ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী সামলাতে হচ্ছে। এক দিনে ১৩৫ জন রোগী ভর্তি হওয়া এবং জরুরি বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ১০০ রোগীকে সেবা দেওয়ার তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। বারান্দা ও সিঁড়ি পর্যন্ত রোগী পৌঁছে যাওয়ার পর ২৮ জনকে একসঙ্গে ছাড়পত্র দিতে হয়েছে—এটি কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়।
এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, দ্রুত ও সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ। ডেঙ্গু ও হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত ওষুধ-স্যালাইন সরবরাহ এবং হাসপাতালের জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে পৌর এলাকার পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ও নিয়মিত উদ্যোগ নিতে হবে।
মণিরামপুরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে শুধু রোগী সামলানোর জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে স্থানীয় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কেন্দ্র হিসেবে শক্তিশালী করতে হবে। রোগ বাড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে রোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। এটা শুধু মণিরামপুরের জন্য নয়, সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্যই প্রযোজ্য।