সম্পাদকীয়
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ক্রীড়া সংস্থাগুলোর নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকায় স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) আগামী নভেম্বরের মধ্যে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর নির্বাচন সম্পন্ন করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি তাই নিছক প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সম্প্রতি এনএসসির ক্রীড়া শাখার এক চিঠিতে অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন শেষ করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অ্যাডহক কমিটিগুলোর প্রধান দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থার গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে স্থানীয় ক্রীড়া প্রশাসনে জবাবদিহি ও নিয়মতান্ত্রিকতা ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হতে পারে।
জেলা পর্যায়ের ক্রীড়া সংস্থাগুলো স্থানীয় খেলাধুলার মূল অবকাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজন, মাঠ ও ক্রীড়া অবকাঠামোর ব্যবহার নিশ্চিত করা— এসব ক্ষেত্রেই তাদের কার্যকর ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু নির্বাচিত কমিটি না থাকলে এসব প্রতিষ্ঠান কতটা গতিশীলভাবে কাজ করতে পারে, সেটিই বড় প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা যে স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নির্বাচন হতে হবে সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। ক্রীড়া সংস্থার গঠনতন্ত্রে যাদের ভোটাধিকার রয়েছে, তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তফসিল, ভোটার তালিকা, মনোনয়ন, আপিল ও ভোটগ্রহণের প্রতিটি ধাপে যেন অযথা হস্তক্ষেপ বা অনিয়মের সুযোগ না থাকে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তির জন্যও সুস্পষ্ট ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচনের পর নতুন কমিটিগুলোকে কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব দিয়ে বসিয়ে রাখলে চলবে না। তাদের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা, নিয়মিত সভা, বার্ষিক ক্রীড়া কর্মসূচি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে খেলাধুলার বাজেট কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, কোন খেলায় কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং স্থানীয় প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে— এসব বিষয়ে জবাবদিহি থাকতে হবে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের এবারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মাঠপর্যায়ে। অতীতে নানা কারণে নির্বাচন বিলম্বিত হয়ে থাকলে সেসব কারণ চিহ্নিত করে এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। অক্টোবরের মধ্যে তফসিল এবং নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।
স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনকে সচল করতে হলে নিয়মতান্ত্রিক ও নির্বাচিত নেতৃত্বের বিকল্প নেই। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল সহযোগিতা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার মাধ্যমে এই নির্বাচনগুলো দ্রুত, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘ স্থবিরতার পর স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে নতুন গতি সঞ্চারের এই সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়।