সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী জমানার সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ড হলো শরীফ ওসমান বিন হাদি খুন। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে দিনদুপুরে কাছ থেকে গুলি করে এই তরুণ অ্যাক্টিভিস্টকে হত্যা করা হয়। কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
মাত্র ৩২ বছর বয়সী হাদি ছিলেন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসেনানী। গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র হিসেবে তার প্রতিটি কথা, লেখা, বক্তৃতা, অ্যাক্টিভিজম- সবই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের পক্ষে। এই কারণে তাকে সহজেই ‘ভারতবিরোধী’ তকমা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সত্য হলো, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার ভারতের স্বার্থে বাংলাদেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছিল, ভাওতাবাজির নির্বাচন বা বিনাভোটে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা থেকে শুরু করে দেশবিরোধী সব কর্মকাণ্ডে ভারত ছিল তাদের অভিন্ন সহযাত্রী। ভারত সেই সরকারপ্রধানকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে আজও বাংলাদেশের আইনি দাবি উপেক্ষা করে যাচ্ছে। ফলে সেই সময় হাসিনাবিরোধী কথা আর ভারতবিরোধী কথার মধ্যে কার্যত কোনো তফাৎ ছিল না।
হাদি হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছিল, কিলাররা ভারতে পালিয়ে গেছে। এরপর একের পর এক নানা ঘটনার ভিড়ে ধীরে ধীরে হাদি হত্যাকাণ্ড চলে যায় বিস্মৃতির অতলে।
এমন হাদি হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর বিজেপি-শাসিত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার সংখ্যালঘু ও বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। কোণঠাসা মমতা ২ জুন কলকাতায় এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক সভায় রীতিমতো বোমা ফাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, বাংলাদেশের জনপ্রিয় তরুণ নেতা হাদির ‘সন্দেহভাজন’ খুনিরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে পশ্চিমবাংলায় চলে আসে। পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স তাদের বনগাঁ থেকে গ্রেপ্তার করার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে (মমতাকে) ফোন করে বলেন, এই ঘটনা যেন গণমাধ্যমে না আসে। মমতা আরও বলেন, হাদি হত্যার পেছনে কারা ছিল তা তিনি জানেন, কিন্তু দেশের স্বার্থে এত দিন মুখ বন্ধ রেখেছিলেন। এখন তার দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনে তিনি সব ফাঁস করে দেবেন।
সেই সময় হাদির সন্দেহভাজন দুই খুনি পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়ার খবর দুই দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তখন তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। সেই নীরবতার কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এখনকার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হচ্ছে। বর্ষীয়াণ এই নেত্রীর বক্তব্য এখন স্পষ্ট করে দিচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ভারতের জড়িত থাকার বিষয়টি শুধু গুঞ্জন ছিল না।
আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমাদের নাগরিককে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করার মিশন পরিচালনা করা কেবল আন্তর্জাতিক অপরাধই নয়, এটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। বাংলাদেশের মানুষ ভারতের কোনো ধরনের খবরদারি-দাদাগিরি আগেও মানেনি, ভবিষ্যতেও মানবে না। মনে রাখা দরকার, ভারতের লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে শেখ হাসিনাকে প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ তথা জনগণ দেখিয়ে দিয়েছে, ভারতের আগ্রাসী মনোভাব, বাংলাদেশের ওপর ঘোরানোর দিন চিরতরে বিলোপ ঘটেছে।
আমরা বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে দেরি না করে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে। লুকোচুরির দিন শেষ। হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা কলকাঠি নেড়েছে, তা আমরা স্পষ্ট জানতে চাই।